পেলের খেলা দেখতে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল

সংবাদ তরঙ্গ ডেস্ক : মৃত্যু সবসময় বিষাদের। বড্ড যন্ত্রণার। মানুষ যাকে আঁকড়ে বেঁচে থাকতে চাই তার প্রস্থানে আরও বেশি কষ্ট পায়। তবে মানুষের চলে যাওয়া নিয়ে কষ্ট পেতে নেই। পেলের মতো মানুষের জন্য একেবারেই নয়। তাঁর প্রিয় ব্রাজিল যখন কাতার বিশ্বকাপে হেক্সা করার স্বপ্ন নিয়ে লড়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই পেলে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শেষ যুদ্ধটা লড়ছিলেন। কিন্তু এবার আর জিততে পারলেন না। ‘মৃত্যু’ নামক ডিফেন্সের জালে চিরতরে আটকে গেলেন। ৩০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দিয়েগো মারাদোনার কাছে চলে যাওয়ার সময় বয়স হয়েছিল ৮২। রেখে গেলেন পরিবার-সহ গোটা দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা অগণিত শুভানুধ্যায়ীদের। ব্রাজিলের কিংবদন্তী ফুটবলার এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, সমগ্রবিশ্বে যিনি পেলে নামে পরিচিত। ১৯৭৭ সালে অবসর নেওয়ার পরেও প্রাক্তন এই ফুটবলার মূলত তিনবার বিশ্বকাপ জয় করার জন্য বিখ্যাত হয়েছেন। তিনিই একমাত্র ফুটবলার, যিনি নারী কিংবা পুরুষ- যিনি এতবার বিশ্বকাপ জয় করেছেন। এছাড়াও তিনি তার ক্লাব ও দেশের হয়ে ১,৩৬৩টি ম্যাচ খেলে মোট ১,২৮১টি গোল করেছেন যা বিশ্ব রেকর্ড। ইতিহাসের বিখ্যাত এই ব্যক্তি সম্পর্কে এমন কিছু গল্প আছে যা অনেকেই হয়তো এখনও শোনেনি। এমন ১০টি গল্প ঘটনা তুলে ধরা হল…..

পেলের খেলা দেখতে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল:পেলের সান্তোস এফসি ফুটবল ক্লাব ছিল ষাটের দশকে বিশ্বের জনপ্রিয় ক্লাবগুলোর একটি। বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে এই ক্লাবটি প্রীতি ম্যাচে অংশ নিতো। এই খ্যাতির কারণে তারা বাড়তি কিছু সুবিধাও পেয়েছিল। এরকম একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল যুদ্ধ-বিধ্বস্ত নাইজেরিয়ায়, ১৯৬৯ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি। বেনিন সিটিতে অনুষ্ঠিত ওই খেলায় সান্তোস ২-১ গোলে স্থানীয় একাদশকে পরাজিত করে। নাইজেরিয়াতে তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল যাতে প্রাণ হারায় প্রায় ১০ লাখ মানুষ। ফুটবল সম্রাটের খেলা দেখার জন্য যুদ্ধরত ২টি পক্ষই সেই ম্যাচের জন্য যুদ্ধ বিরতিতে সম্মত হয়। এই বিষয়ে পেলে তার একটি আত্মজীবনী লিখেছেন ‘ওই প্রদর্শনী ম্যাচের জন্য গৃহযুদ্ধ থামানো হবে বলে’ খেলোয়াড়দেরকে জানানো হয়েছিল। আমি জানি না এই ঘটনা পুরোপুরি সত্য কীনা, তবে নাইজেরিয়ানরা আমাদের নিশ্চিতভাবে জানিয়েছিলেন যে আমরা যখন ওখানে খেলতে যাবো তখন বায়াফ্রানরা সেখানে আক্রমণ করবে না।

পেলে তার জীবনে কোনো ইউরোপীয় ক্লাবে খেলেননি:ব্রাজিলের অন্যান্য বিখ্যাত ফুটবলাররা বিদেশি ক্লাবে খেললেও, পেলের ক্যারিয়ারের সোনালী সময়ে তাকে বাইরে খেলতে যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে। পেলেকে নেওয়ার জন্য সান্তোস এফসিকে প্রস্তাব দিয়েছিল রিয়াল মাদ্রিদ থেকে শুরু করে এসি মিলানের মতো ক্লাবও। সেসময় ফুটবলাররা কোন ক্লাবে খেলবেন সে বিষয়ে তাদের কথা বলার সুযোগ ছিল খুব কম। পেলেকে ব্রাজিলে রেখে দেওয়ার জন্য চাপ ছিল সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকেও। ১৯৬১ সালের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জানিও কোয়াদ্রস পেলেকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাকে ‘রপ্তানি করা যাবে না’ বলে একটি ডিক্রিও জারি করেছিলেন। তবে ১৮ বছর ব্রাজিলের হয়ে খেলার পরে এই ফুটবলার অবশ্য একটি বিদেশি ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন। শুধুমাত্র ১৯৭৫ সালে। সেসময় তিনি যোগ দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফুটবল ক্লাব নিউ ইয়র্ক কসমসে।

ব্রাজিলের অধিনায়ক হয়েছিলে ন৫০বছর বয়সে:৩টি বিশ্বকাপ জয় করা পেলে তার পুরো ফুটবল ক্যারিয়ারে তার হাতে মাত্র একবারই অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেছিলেন। ক্লাব ও দেশের অধিনায়কত্ব গ্রহণ করার জন্য তাকে যখনই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, সেটা তিনি সবসময় প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু এই ঘটনার ব্যতিক্রম হয় পেলের ৫০ বছর বয়সে। সেটা ছিল ১৯৯০ সালের ঘটনা, জাতীয় ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার ১৯ বছর পরে। সে বছর ব্রাজিলের সাথে বাকি বিশ্বের একটি প্রীতি ম্যাচ হয়েছিল মিলানে। তাতে অংশ নিয়েছিলেন পেলে। তার ৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই ম্যাচের আয়োজন করা হয়। প্রথমার্ধের ৪৫ মিনিট তিনি মাঠে ছিলেন। সে ম্যাচে ব্রাজিল ২-১ গোলে হেরে যায়।

পেলেকে একবারঅপহরণকরা হয়েছিল:সান্তোস এফসি ক্লাবের ফুটবলাররা ১৯৭২ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোতে খেলার ব্যাপারে আগ্রোহী ছিলেন না। কারণ সেসময় সেখানে বড় ধরনের অশান্তি চলছিল। তারপরও ক্লাবটি ম্যাচের আয়োজন করে। খেলার ৪৩ মিনিটে মাথায় গোল করে বসেন পেলে। তখনই সবকিছু বদলে যায়। খেলা শেষে পোর্ট অফ স্পেন স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে থাকা সমর্থকরা দৌড়ে মাঠের ভেতরে চলে আসে এবং পেলেকে কাঁধে নিয়ে রাস্তায় বের হয়ে যান। সেখান থেকে পেলেকে উদ্ধার করে আনতে বেশ কিছু সময় লেগেছিল।

সিলভেস্টার স্ট্যালোনের সঙ্গে ছবিতে অভিনয়:১৯৮০ সালে যখন ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’ ছবির শুটিং শুরু হয় তখন চলচ্চিত্রাঙ্গনে খ্যাতির তুঙ্গে ছিলেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন। এই ছবিতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ের নাৎসি একাদশ ও বন্দীদের মধ্যে একটি কাল্পনিক ফুটবল ম্যাচের গল্প তুলে ধরা হয়। ছবিটিতে পেলেও অভিনয় করেছেন। তার সাথে ছিলেন ববি মুরের মতো আরো কয়েকজন পেশাদার ও সাবেক ফুটবলারও। ওই খেলায় গোলরক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেন সিলভেস্টার স্ট্যালোন। ছবির একটি দৃশ্যে পেলে অ্যাক্রোবেটিক বাইসাইকেল কিক নিয়েছিলেন।

পেলে যখন রাজনীতিতে:পেলে ১৯৯০ সালে সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণা করেছিলেন যে তিনি ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন। কিন্তু পরে সেটা আর হয়নি। তবে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন ঠিকই। ১৯৯৫ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত এই তিন বছর তিনি ব্রাজিলের ক্রীড়া মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। সে সময় তার নেতৃত্বে কিছু আইন তৈরি হয়েছিল যাতে পেশাদার ফুটবলারদেরকে ক্লাবের সঙ্গে দর কষাকষির ব্যাপারে কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যা তার সময়ের ফুটবলারদের ছিল না।

মাঠ থেকে বহিষ্কার:১৯৬৮ সালের ১৮ই জুন। কলাম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায়, পেলের ক্লাব সান্তোস এফসির সাথে এক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয় কলাম্বিয়ান অলিম্পিক স্কোয়াড। তিল ধারনের জায়গা ছিল না স্টেডিয়ামটিতে। কানাকানায় পূর্ণ স্টেডিয়ামের গ্যালারি থেকে হঠাৎ করেই দর্শকদের দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসতে থাকে, কারণ রেফারি গুইলেরমো ভেলাসকোয়েজ তার বাঁশি বাজিয়ে পেলেকে মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। তখনও লাল কার্ডের প্রচলন ঘটেনি, সেটা শুরু হয় ১৯৭০ সালে। কলাম্বিয়ার একজন ডিফেন্ডারকে ফাউল করার কারণে পেলেকে মাঠ থেকে চলে যেতে বলা হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তে মাঠের ভেতরে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। সান্তোসের ফুটবলাররা উত্তেজিত হয়ে রেফারিকে ঘিরে ধরেন। ওই খেলার যেসব ছবি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় রেফারি ভেলাসকোয়েজের চোখ কালো হয়ে আছে।সেসময় দর্শকরাও রেফারির ওই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছিল। রেফারি ভেলাসকোয়েজ পরে ২০১০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে সেসময় তাকে মাঠ থেকে বিদায় নিয়ে বাঁশিটা লাইন্সম্যানকে দিতে বলা হয়েছিল। এর পরপরই পেলে আবার খেলায় ফিরে আসেন।

পেলে যখন গোলকিপার:পেলে যদি ‘এসকেপ টু ভিক্টরি’ ছবিতে গোলকিপারের ভূমিকায় অভিনয় করতেন তিনি কিন্তু দর্শকদের মোটেও হতাশ করতেন না। বাস্তব জীবনেও তিনি ক্লাব ও দেশের বিকল্প গোলকিপার ছিলেন। প্রথম একাদশের গোলকিপার আহত হলে তাঁর জায়গায় পেলে তিনকাঠির নিচে দাঁড়িয়ে যেতেন। পুরো ক্যারিয়ারে পেলে স্যান্টোস এফসি ক্লাবের হয়ে চারবার গোলকিপারের গ্লাভস পরেছিলেন। ১৯৬৪ সালে ব্রাজিলিয়ান কাপের সেমিফাইনালেও তাঁর গোলকিপিং করতে দেখা গিয়েছিল। পেলে কিন্তু গোলকিপার হিসেবে একটিও গোলও হজম করেননি।

পেলের সঙ্গে দেখা করতে বিটলসের ব্যর্থ চেষ্টা:পেলে নিউইয়র্ক কসমস ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য ১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক শহরে চলে যান। সেখানে গিয়ে একটি স্কুলে তিনি ইংরেজি শিখতেন। কোনও একদিন ক্লাসের ফাঁকে সংগীত গোষ্ঠী বিটলসের জন লেননের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছিল। লেনন সেই স্কুলে জাপানি ভাষা শিখতে যেত। পেলে তাঁর আত্মজীবনীতে সেই ঘটনার কথা লিখেছিলেন। পেলে সেখানে আরও লিখেছিলেন, জন লেনন আমাকে বলেছে যে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ চলার সময় লেনন এবং বিটলসের অন্য শিল্পীরা হোটেলে গিয়ে ব্রাজিলের টিমের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা আমাদের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দেয়নি।

মাত্র একজনই পেলে: ভক্তরা আনন্দের সঙ্গে গান ধরতে পারে ‘আছে মাত্র একজনই পেলে!’ কিন্তু আসলে এটি আক্ষরিকভাবে পুরোপুরি সত্য নয়। তাঁর জনপ্রিয়তার কারণে সারা বিশ্বে মাঠে ও মাঠের বাইরে এই নামের আরও অনেককেই পাওয়া যায়। আফ্রিকার বিখ্যাত ফুটবলারদের একজন আবেদি এইও-র নাম হয়েছিল আবেদি পেলে। তিনি ঘানা ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি ক্লাবের হয়ে খেলেছেন। কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার পেদ্রো মন্টেইরো যিনি ২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে যোগ দিয়েছিলেন, তিনিও পেলে নামে পরিচিত ছিলেন। এই ডাকনাম তিনি পেয়েছিলেন তাঁর শৈশবে। কিন্তু ফুটবলার পেলের প্রভাব কতটা পড়েছিল ব্রাজিলের সমাজে, সেটা বোঝা যায় পেলের আসল নাম এডসন থেকে। ব্রাজিলের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান ভূগোল ও পরিসংখ্যান ইন্সটিটিউটের হিসেবে প্রচুর শিশুর নাম রাখা হয়েছে এডসন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ব্রাজিলে ৪৩৫১১ জনের নাম ছিল এডসন। কিন্তু এর দুই দশক পর, পেলে যখন এক হাজারেরও বেশি গোল করেন এবং তিনটি বিশ্বকাপ জয় করেন, তখন এই নামের মানুষের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ১১ হাজারেরও বেশি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *