সংবাদ তরঙ্গ ডেস্ক: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি)। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে নিবন্ধন লাভ করা এই দলটি এক গভীর বিশ্লেষণাত্মক বিবৃতিতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং অধিকার বঞ্চিত অতি প্রান্তিক সম্প্রদায়ের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চেয়েছে। এই নিশ্চয়তা না পেলে নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
বিএমজেপি’র এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণায় দলটির সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল এবং মহাসচিব দিলীপ কুমার দাস স্বাক্ষর করেন। তাঁদের যৌথ বিবৃতিতে, দলটি তাদের মূল দার্শনিক ভিত্তি এবং পাঁচটি প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছে, যা বাংলাদেশের চলমান সাংবিধানিক সংস্কার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
১.১. শিরোনাম ও সংবাদ পরিচিতি
বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে, যখন জাতি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করার অঙ্গীকারবদ্ধ, তখন বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি (বিএমজেপি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে (যা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিলের প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে) কেন্দ্র করে তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায় স্পষ্ট করেছে। দলটি ২০১৭ সালে অধিকার প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ৯ই এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন থেকে রকেট প্রতীকে নিবন্ধন লাভ করে। নির্বাচন কমিশন থেকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কঠোর আইনি শর্তাবলী পালন করতে হয়, যা Representation of the People Order, 1972-এর ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত। এই শর্তাবলী পূরণ করে জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করা বিএমজেপি, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছে। দলটির নেতৃত্ব কাঠামোয় সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল, মহাসচিব দিলীপ কুমার দাস এবং সহ-সভাপতি আর কে মন্ডল (রবিন) ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং অধিকার বঞ্চিত অতি প্রান্তিক সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
১.২. বিএমজেপি’র দার্শনিক ভিত্তি: মাইনরিটি’র সম্প্রসারিত সংজ্ঞা
বিএমজেপি তাদের মূল স্লোগান হিসেবে গ্রহণ করেছে, নির্যাতিত, নিপীড়িত, শোষিত ও অধিকার বঞ্চিত মানুষ মাত্রই – মাইনরিটি। ঐতিহ্যগতভাবে, সংখ্যালঘু শব্দটি ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও, বিএমজেপি তাদের সংজ্ঞাকে একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে নিয়ে এসেছে। এই সম্প্রসারিত সংজ্ঞাটি কেবল ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার শিকার সকল নাগরিককে অন্তর্ভুক্ত করে। এই কৌশলটি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে যে সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জবাবদিহিতার আন্দোলন শুরু হয়েছে, বিএমজেপি সেই বৃহত্তর বঞ্চনার অনুভূতিকে পুঁজি করে একটি বিস্তৃত জোট গঠনের চেষ্টা করছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক দলগুলোর (যেমন জামায়াত-ই-ইসলামী, যাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছে) সক্রিয়তা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বিএমজেপি
ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এজেন্ডাকে শক্তিশালী রেখেও, তাদের সংজ্ঞায়িত সম্প্রসারিত মাইনরিটি’র মাধ্যমে একটি অসাম্প্রদায়িক, অধিকারভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে সচেষ্ট। এটি তাদের চরম রক্ষণশীল বা জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলো থেকে নিজেদের পৃথক করে একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখে বিএমজিপি সংযুক্ত করা যায় কি না?
২. নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সংকট: নির্বাচনী অংশগ্রহণের মূল শর্ত যাচাই
বিএমজেপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রথম ও প্রধান শর্ত হিসেবে নির্বাচনের স্বচ্ছতা,নিরপেক্ষতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নির্ভয়ে ভোট প্রদানের নিশ্চয়তা চেয়েছে। দলটির মূল নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে এক নম্বরেই রয়েছে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নিপীড়ন ও ভূমি দখল থেকে জানমাল ও উপাসনালয়ের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।
২.১. ভয়মুক্ত নির্বাচন বনাম অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ
আগস্ট ২০২৪-এ শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। সেই সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ব্যাপক সহিংসতা, হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪ আগস্ট থেকে ২০ আগস্ট, ২০২৪ পর্যন্ত মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে সারাদেশে ২,০১০টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এই সহিংসতায় ৯ জন নিহত হয় এবং ৬৯টি উপাসনালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। এছাড়া ৯১৫টি বাড়িঘর এবং ৯৫৩টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এই হামলার ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পরেও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সময়ে প্রায় ২ কোটি ধর্মীয়- জাতিগত সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী বর্তমানে আতঙ্ক ও ভয়ের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এসব হামলার নিন্দা জানিয়েছিল, তবুও জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুসারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পতনের কারণে অপরাধীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এই প্রেক্ষাপটে, বিএমজেপি’র নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের দাবি একটি কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং একটি অপরিহার্য সামাজিক চাহিদা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২.২. ভূমি দখল রোধ: ভি.পি. অ্যাক্ট থেকে সিএইচটি’র সংকট
বিএমজেপি’র ইশতেহারে ভূমি দখল থেকে সুরক্ষার অঙ্গীকারটি ঐতিহাসিক এবং বর্তমান উভয় প্রকার বঞ্চনার শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য অপরিহার্য। স্বাধীনতার আগে ও পরে দীর্ঘদিন ধরে বলবৎ থাকা শত্রু সম্পত্তি আইন (পরবর্তীতে ভি.পি. অ্যাক্ট বা অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে পরিচিত) এর অপব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের, বিশেষত হিন্দুদের, প্রায় ৭৫% সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। ভি.পি. অ্যাক্ট-এর অবশিষ্ট প্রভাব দূর করা এবং এর অপব্যবহার বন্ধ করা বিএমজেপি’র প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মূল ভিত্তি। একইভাবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম (CHT) অঞ্চলের আদিবাসীদের ভূমি দখলের চলমান সংকট চরম মানবাধিকার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সাম্প্রতিককালে, ২০২৫ সালের প্রথম দিকে লামা রাবার
ইন্ডাস্ট্রিজ দ্বারা ভূমি দখলের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সমর্থন ছিল বলে অভিযোগ উঠেছে, যা UN Special Rapporteurs-দের উদ্বেগের কারণ হয়েছে। ভূমি দখল কেবল একটি সাধারণ অপরাধমূলক কাজ নয়, বরং এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত বৈষম্যের ফসল। বিএমজেপি যদি তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে তাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে। বিএমজেপি তাদের
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বা মানবাধিকার এজেন্ডা বাস্তবায়নে, এই সংবেদনশীল বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতেচায়, যা সময়ের দাবী:
রাজনৈতিক সদিচ্ছা: পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রকাশ ও তা প্রয়োগ করতে হবে। শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা: আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার সুরক্ষিত রাখতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে দ্রুত ও কার্যকরভাবে শক্তিশালী আইনি ব্যবস্থা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
২.৩. নিরাপত্তা পরিকল্পনায় জন–আস্থার অভাব
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী নির্বাচনে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে এবং ভোটদানের নির্ভয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নিবিড় টহল এবং ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার নির্দেশ। তবে, সংখ্যালঘুদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর অবিশ্বাস বিদ্যমান থাকায়, তারা সরাসরি রাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী নিশ্চয়তা দাবি করছে। যেমন, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কমপক্ষে এক মাস আগে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সেনা ও বিশেষায়িত বাহিনী মোতায়েনের দাবি জানিয়েছে। ইসির দেওয়া আশ্বাস সত্ত্বেও, এই ধরনের উচ্চ-স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দাবি প্রমাণ করে যে আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকারিতা এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকট রয়েছে। বিএমজেপি এই আস্থার অভাবকে কাজে লাগিয়ে তাদের নির্বাচনী শর্তকে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
৩. রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন: জুলাইসনদ এবং আনুপাতিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা
৩.১. সংসদে ন্যায্য কণ্ঠস্বরের অভাব
বিএমজেপি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে জাতীয় সংসদে সংখ্যালঘুদের ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব থাকা অপরিহার্য। বাংলাদেশে জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব ঐতিহাসিকভাবেই কম ছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা আসনসহ মোট ৩১৫ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে মাত্র ১৪ জন ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছিলেন, যা মোট সদস্যের ৪.৪৪ শতাংশ মাত্র। এই অপ্রতিনিধিত্বের কারণে সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষাকারী আইন প্রণয়ন ও নীতি নির্ধারণে তাদের কণ্ঠস্বর দুর্বল থাকে।
৩.২. জুলাই সনদের মাধ্যমে সাংবিধানিক সংস্কারের সুযোগ
আগস্ট ২০২৪ গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি উচ্চাভিলাষী সাংবিধানিক সংস্কার এজেন্ডা শুরু করে, যার ফলস্বরূপ জুলাই সনদ ২০২৫ প্রণীত হয়। এই সনদে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উচ্চকক্ষ নির্বাচনের ফলাফলের আনুপাতিক ভোটের ভিত্তিতে নির্বাচিত হবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation—PR) পদ্ধতিটি ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সংসদে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। যেহেতু বিএমজেপি’র মতো নতুন দলগুলির জন্য সরাসরি ৩০০টি আসনে জয়লাভ করা কঠিন হতে পারে, তাই আনুপাতিক ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চকক্ষে আসন নিশ্চিত করা তাদের রকেট প্রতীকে প্রাপ্ত মোট ভোটকে জাতীয় রাজনীতিতে অর্থবহ প্রতিনিধিত্বে রূপান্তর করতে সাহায্য করবে। এই ব্যবস্থা শাসক দলের ক্ষমতার একচেটিয়া ব্যবহার রোধ করতে এবং ছোট দলের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।
৩.৩. জুলাই সনদের সমালোচনায় বিএমজেপি’র অবস্থান
যদিও জুলাই সনদ সাংবিধানিক সংস্কারের পথে একটি বড় পদক্ষেপ, তবুও সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের বিষয়ে এর সমালোচনা রয়েছে। নারীর রাজনৈতিক অধিকার ফোরামএর মতো সংগঠন অভিযোগ করেছে যে প্রত্যাশিত জুলাই জাতীয় সনদে নারী এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার বিষয়ে কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনা হয়নি। জুলাই সনদ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তীব্র মতভেদ বিদ্যমান—যেমন বিএনপি সহ অন্যান্য দল রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে আপত্তির নোট দিয়েছে। এই রাজনৈতিক বিভাজন বিএমজেপি’র জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি করেছে। দলটি এই সমালোচনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে নিজেদেরকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কারের প্রকৃত প্রবক্তা হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের সম্প্রসারিত মাইনরিটি দর্শন ব্যবহার করে তারা সাংবিধানিক সংস্কারের আলোচনায় সংখ্যালঘুদের অধিকারকে মূল ফোকাসে নিয়ে আসার চেষ্টা করছে।
৪. সম–অধিকার ও ধর্মনিরপেক্ষতা: সাংবিধানিক দ্বৈততা নিরসন
৪.১. সম-অধিকার ও বৈষম্য দূরীকরণের প্রতিজ্ঞা
বিএমজেপি তাদের ইশতেহারে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সকল ধরনের বৈষম্য দূর করে সমান সুযোগ নিশ্চিত করার বিষয়ে বদ্ধপরিকর। এই প্রতিশ্রুতি ভূমি অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈষম্য নিরসনের ওপর জোর দেয়। বর্তমানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় শিক্ষায়তনের উন্নয়ন ও বিকাশে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ধর্মীয় শিক্ষকদের বেতনকাঠামোর বৈষম্য দূর করা জরুরি বলে একাধিক সংখ্যালঘু সংগঠন দাবি জানিয়েছে। এই বৈষম্যগুলো দূর করার মাধ্যমে একটি সামগ্রিক সমতাভিত্তিক সমাজ তৈরি করাই দলটির লক্ষ্য।
৪.২. ধর্মনিরপেক্ষতা বনাম রাষ্ট্রধর্ম: সংবিধানে বিএমজেপি’র চ্যালেঞ্জ
বিএমজেপি’র মূল অঙ্গীকারের মধ্যে অন্যতম হলো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সকল ধর্মের স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন বাংলাদেশের সংবিধানের একটি দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে ধর্মনিরপেক্ষতা পুনঃস্থাপিত হলেও, একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ২ক-এ ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখা হয়, যদিও অন্যান্য ধর্মের সম-মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। আইন ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধানে রাষ্ট্রধর্মের উপস্থিতি একটি সাংবিধানিক দ্বৈততা বা বৈষম্য তৈরি করে। সমালোচকরা মনে করেন যে এই ধারাটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দাবিকে দুর্বল করে এবং সাংবিধানিক মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিএমজেপি’র ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি পূরণে সংবিধান থেকে রাষ্ট্রধর্মের ধারা বাতিলের জন্য রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা আবশ্যক হবে। তবে, এই দাবির রাজনৈতিক ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি জামায়াত-ই-ইসলামীর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক প্রবণতা রক্ষণশীলতার দিকে ঝুঁকছে বলে ইঙ্গিত দেয়। এই পরিস্থিতিতে, রাষ্ট্রধর্ম বাতিলের দাবি ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে এবং রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। বিএমজেপিকে তাদের এই আদর্শিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করতে হবে।
৫. নির্বাচনের পথে: কৌশলগত অবস্থান ও ভবিষ্যতের রোড ম্যাপ
৫.১. বিএমজেপির কৌশলগত নির্বাচন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মঞ্চে বড় দলগুলোর অংশগ্রহণে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। প্রাক্তন শাসক দল আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাস দমন আইনের আওতায় তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে, অনেক পুরাতন রাজনৈতিক দল বলছে যে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টিকে বিচারের আগে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। এই রাজনৈতিক শূন্যতা বিএমজেপি’র মতো নতুন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষাকারী দলগুলোর জন্য জনসমর্থন আদায়ের এক বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বিএমজেপি তাদের নির্বাচনী প্রতীক রকেটকে পরিবর্তন, গতি এবং আধুনিক, বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের দিকে দ্রুত অগ্রগতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে চায়। তাদের বিস্তৃত মাইনরিটি দর্শন এই কৌশলকে সমর্থন করে, যা তাদের শুধু ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের দল না হয়ে, সামগ্রিক ন্যায়বিচারের প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত করতে পারে।
৫.২. দেশের উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণ: ঐক্যের আহ্বান
বিএমজেপি সভাপতি এবং মহাসচিব যৌথ বিবৃতিতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে এবং তাদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানানো হয়। তারা দেশের উন্নয়নে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের অঙ্গীকার সত্ত্বেও, সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিএমজেপি’র এই আহ্বান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে একটি একক, ঐক্যবদ্ধ ভোটিং ব্লক তৈরি করার জন্য উৎসাহিত করবে, যা কেবল তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তিই বাড়াবে না, বরং ভবিষ্যতে অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং দর কষাকষির জন্য অপরিহার্য হবে।
৫.৩. নেতৃত্বের চূড়ান্ত বার্তা এবং ঐতিহাসিক দায়িত্ব
বিজয় দিবস ২০২৫ উপলক্ষ্যে প্রদত্ত এই বার্তাটি কেবল একটি নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাকালীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের আহ্বান। সভাপতি সুকৃতি কুমার মন্ডল, মহাসচিব দিলীপ কুমার দাস এবং সহ-সভাপতি আর কে মন্ডল (রবিন) -এর যৌথ নেতৃত্ব এই দলটিকে জাতীয় রাজনীতিতে একটি গুরুতর শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। বিএমজেপি’র এই নির্বাচনী অঙ্গীকারগুলি বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকটের মূল বিষয়গুলিকে স্পর্শ করেছে। তাদের সাফল্য নির্ভর করবে কেবল প্রতিশ্রুতি প্রদানের ওপর নয়, বরং অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামোগত সংস্কারের বাস্তব গ্যারান্টি আদায়ের ওপর। যদি সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে বিএমজেপি’র নির্বাচনী বর্জন দেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি গভীর সংকটের কারণ হতে পারে।
পরিশেষে–
বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির শর্তসাপেক্ষ নির্বাচনী ঘোষণা বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা। এই বার্তাটি হলো— কেবল একটি নির্বাচন আয়োজন করাই যথেষ্ট নয়,বরং নতুন বাংলাদেশে সকল নাগরিকের জন্য ন্যায়বিচার ও সমান অধিকার নিশ্চিত করার কাঠামোগত পরিবর্তন অপরিহার্য। বিএমজেপি তাদের স্লোগানের মাধ্যমে প্রান্তিকতা, নিপীড়ন এবং শোষণের শিকার সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার যে চেষ্টা করছে, তা যদি সফল হয়, তবে তা ২০২৬ সালের নির্বাচনে একটি শক্তিশালী তৃতীয় ধারার জন্ম দিতে পারে। তবে, তাদের মূল প্রতিশ্রুতি— বিশেষত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সাংবিধানিক বৈষম্য দূরীকরণ— বাস্তবায়নের জন্য অন্তর্বর্তী সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, বিএমজেপি’র মতো দলগুলো যদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকে, তবে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনটি আবারও অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র হারাবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অর্জিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের প্রক্রিয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।