বিশেষ প্রতিবেদক, শাহরিয়ার | ঢাকা
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় শুধু আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন সুপরিকল্পিত উদ্যোগ, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, উপকূলীয় লবণাক্ততা ও তীব্র তাপপ্রবাহের মতো ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, নাগরিক সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১ (COP31)। সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলার পরিকল্পনাগুলো কীভাবে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে।
পরিকল্পনা আছে, প্রয়োজন সমন্বিত বাস্তবায়ন
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান—NAP) ২০২৩-২০৫০ প্রণয়ন করা হয়েছে। পানি সম্পদ, কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ, নগর উন্নয়ন, জীববৈচিত্র্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই পরিকল্পনায়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য অনুযায়ী, পরিকল্পনাটিতে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বাস্তবায়নের জন্য ৯০টি উচ্চ অগ্রাধিকার এবং ২৩টি মধ্যম অগ্রাধিকারের উদ্যোগ চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর মোট বিনিয়োগ প্রয়োজন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
জলবায়ু ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. ইকবাল কবীর বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৬-৩০ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশের জন্য আগামী ৫ বছরে ১৭ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন (১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রথমেই প্রয়োজন ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল ও জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা। কোন এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে, কোথায় নদীভাঙনের ঝুঁকি বেশি, কোন শহরে জলাবদ্ধতা বা তাপপ্রবাহের প্রভাব তীব্র—এসব তথ্যের ভিত্তিতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের (সিথ্রিইআর) উপদেষ্টা ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্বাস্থ্য খাতে ক্রমবর্ধমান চাপ বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও অর্থায়নে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। স্বাস্থ্য, পানি ও অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এইচএনএপি দিকনির্দেশনা দেবে। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ের এ উদ্যোগকে সহায়তা দিতে আন্তর্জাতিক অভিযোজন অর্থায়নও প্রয়োজন, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় অনুদানের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার সঙ্গে স্থানীয় সরকার, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় জরুরি। এতে প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি কমবে এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হবে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় কী কী পদক্ষেপ জরুরি
জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করা প্রয়োজন।
উপকূলীয় সুরক্ষা: টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রের উন্নয়ন এবং দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
পানি ও কৃষি ব্যবস্থাপনা: বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, নিরাপদ পানির উৎস তৈরি, লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষিপদ্ধতি সম্প্রসারণ করতে হবে। পাশাপাশি কৃষক ও মৎস্যজীবীদের জন্য আবহাওয়াভিত্তিক পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।৮
শহরের জলবায়ু ঝুঁকি: জলাশয় ও খাল সংরক্ষণ, কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বৃক্ষরোপণ, সবুজ এলাকা বৃদ্ধি এবং ভবন ও নগর অবকাঠামো নির্মাণে জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে। তাপপ্রবাহের সময় শ্রমজীবী মানুষ, শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ প্রস্তুতি: তীব্র গরম, দূষিত পানি ও দুর্যোগ-পরবর্তী রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুত রাখতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল, উদ্ধার সরঞ্জাম, জরুরি আশ্রয় ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
প্রকৃতি সংরক্ষণ: বন, নদী, জলাভূমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। পরিবেশের ক্ষতি করে এমন উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন জবাবদিহি
জলবায়ু পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করে অর্থের সঠিক ব্যবহার, প্রকল্পের মান এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়ার ওপর। এ জন্য প্রতিটি প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য, সময়সীমা, বাজেট ও পরিমাপযোগ্য ফলাফল নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
জলবায়ু প্রকল্পে বরাদ্দ ও ব্যয়ের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ, নিয়মিত স্বাধীন নিরীক্ষা এবং প্রকল্পের অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্থানীয় জনগণকে পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণ পর্যন্ত সম্পৃক্ত করতে হবে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী—কৃষক, জেলে, উপকূলীয় নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বাস্তুচ্যুত পরিবার—যাতে সহায়তা থেকে বাদ না পড়ে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অর্থায়ন ছাড়া বাস্তবায়ন কঠিন
জলবায়ু অভিযোজনের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশের পক্ষে এককভাবে সব ব্যয় বহন করা কঠিন। তাই আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল, উন্নয়ন সহযোগী এবং বহুপক্ষীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তে অর্থায়নের পাশাপাশি অনুদানের পরিমাণ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় সহায়তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন।
তবে অর্থায়ন পেলেই হবে না; কোন প্রকল্পে কত অর্থ ব্যয় হলো এবং তাতে মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এল, তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে।
জলবায়ু মোকাবিলায় তরুণদের ভূমিকা
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। তাই তরুণদের শুধু সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিকল্পনা প্রণয়ন, উদ্ভাবন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা প্রয়োজন।
গবেষণা ও উদ্ভাবন: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ গবেষকেরা স্থানীয় জলবায়ু ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির নতুন সমাধান তৈরি করতে পারেন।
স্থানীয় উদ্যোগ: স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক জলবায়ু ক্লাব গঠন, বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা, প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, জলাশয় পরিষ্কার এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে তরুণদের সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহার: তরুণ প্রযুক্তিবিদেরা স্থানীয় বন্যা, জলাবদ্ধতা ও তাপপ্রবাহের তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি এবং আগাম সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারেন।
নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ: জলবায়ু বাজেট, স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও আন্তর্জাতিক সম্মেলনসংক্রান্ত আলোচনায় তরুণদের মতামত গ্রহণ করতে হবে। তরুণ প্রতিনিধিদের শুধু অংশগ্রহণকারী হিসেবে নয়, বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহ ভূমিকা দেওয়াও জরুরি।
জলবায়ু উদ্যোক্তা তৈরি: পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য, বর্জ্য থেকে সম্পদ তৈরি, পরিবেশবান্ধব কৃষি, সৌরশক্তি এবং পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তিতে তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন দেওয়া যেতে পারে। এতে পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও তৈরি হবে।
কপ৩১-এ বাংলাদেশের প্রত্যাশা
জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, বিজ্ঞানী, তরুণ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। সম্মেলনের আলোচনাকে বাস্তব অগ্রগতিতে রূপ দিতে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের জন্য এ সম্মেলন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি তুলে ধরারও সুযোগ। জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি কীভাবে বাস্তব প্রকল্পে রূপান্তরিত হবে, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের কাছে সহায়তা কত দ্রুত পৌঁছাবে এবং তরুণদের অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত হবে—এসব প্রশ্নে স্পষ্ট অগ্রগতি প্রয়োজন।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত অভিযোজন, কার্যকর বাস্তবায়ন, স্বচ্ছ অর্থায়ন এবং জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নে যাওয়া—যেখানে সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা, গবেষকদের জ্ঞান এবং তরুণ প্রজন্মের উদ্ভাবনী শক্তি।
তথ্যসূত্র:
১. জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি—বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা ২০২৩-২০৫০
২. UNFCCC—কপ৩১ সম্মেলনের তথ্য
৩. বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোজন বাস্তবায়নের কাঠামো—ICCCAD