বিশেষ প্রতিবেদক, শাহরিয়ার | ঢাকা
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা, ন্যায্য জলবায়ু অর্থায়ন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার দাবি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মুখোমুখি বাংলাদেশ। আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিত হবে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন—কপ৩১ (COP31)। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জলবায়ু ঝুঁকিকে কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অর্থায়নে রূপ দেওয়া। সূত্র: UNFCCC
জলবায়ু ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা ও উপকূলীয় লবণাক্ততার মতো নানা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও পানিসম্পদের ওপর চাপ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি, মৎস্য, জীববৈচিত্র্য, অবকাঠামো ও জনস্বাস্থ্যে। সূত্র: বাংলাদেশের জাতীয় জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়ন
বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। লবণাক্ততা, সুপেয় পানির সংকট ও দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমির ক্ষতি অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
অর্থায়ন ও জলবায়ু ন্যায়বিচার
জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের অবদান তুলনামূলকভাবে কম হলেও এর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে পর্যাপ্ত, সহজলভ্য ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে অনুদান ও ঋণের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ওপর ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে অভিযোজন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ক্ষয়ক্ষতি পুনরুদ্ধারে সহায়তা বাড়ানোর দাবি জোরালো হচ্ছে।
১৫ অক্টোবর ঢাকায় কপ৩১-এ বাংলাদেশের অগ্রাধিকার নিয়ে এক বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জলবায়ু ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, ক্ষয়ক্ষতি তহবিল, ন্যায্য রূপান্তর ও সবুজ প্রবৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়। সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন
আলোচনার বাইরে নয় তরুণ প্রজন্ম
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তরুণদের অংশগ্রহণও গুরুত্ব পাচ্ছে। অক্টোবরে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (BYLC), পরিবেশ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের উদ্যোগে ঢাকায় তরুণদের জলবায়ু আলোচনা ও আন্তর্জাতিক দর-কষাকষি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায়বিচার নিয়ে আলোচনা হয়। সূত্র: দ্য ক্লাইমেট ওয়াচ
প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নই প্রত্যাশা
কপ৩১-এ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব সহায়তায় রূপ দেওয়া। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, কৃষির অভিযোজন, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে অর্থায়ন বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের আলোচনায় তাই একটি প্রশ্নই সামনে আসছে—আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে পৌঁছাবে ঝুঁকিতে থাকা মানুষের কাছে?
বাংলাদেশের প্রত্যাশা, কপ৩১ এমন সিদ্ধান্তের পথ তৈরি করবে, যাতে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব নিশ্চিত হয়। কারণ জলবায়ু সংকটের সমাধান শুধু আলোচনার টেবিলে নয়, তার সুফল পৌঁছাতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জীবনেও।