ইতিহাসে বিশ্বনেতাদের আলোচিত উত্থান, পতন ও পরিসমাপ্তি

রেহানা ফেরদৌসী

বিশ্বের ইতিহাসে অনেক ক্ষমতাধর নেতা ক্ষমতার শিখরে উঠেছেন, কিন্তু পরে তাদের পতন হয়েছে এবং অনেকেই আদালতের রায়ে মৃত্যুদন্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইতিহাস বলে, একনায়কতন্ত্র, রাজতন্ত্র বা সামরিক শাসন-ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অনেক শাসকই শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছেন নিজেদের দেশের আদালতের সামনে এবং চূড়ান্ত সাজা, অর্থাৎ মৃত্যুদন্ডের মুখোমুখি হতে হয়েছে। কারো সাজা ঘোষণার পর খুব দ্রুত তা কার্যকর হয়েছে, কেউ আবার মৃত্যুদন্ড পেয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছেন বা পরে ক্ষমতায়ও ফিরেছেন।

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য বিশ্ব নেতাগণ:

ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লস: ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম চার্লসও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। ইউরোপে প্রথমবারের মতো প্রজাদের হাতে কোনো রাজার বিচার হয়েছিল ১৬৪৯ সালে। সংসদ ভেঙে ব্যক্তিগত শাসন, কর আরোপ ও ধর্মীয় সংস্কারের সিদ্ধান্তে চার্লস প্রথমের প্রতি জনরোষ বাড়তে থাকে। সংসদীয় বাহিনীর কাছে পরাজয়ের পর তাকে রাষ্ট্রদ্রোহে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তার মৃত্যুর পর ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যদিও পরে তা ফিরে আসে। ১৬৪৯ সালে ইংরেজ গৃহযুদ্ধের পর প্রথম চার্লসকে শিরশ্ছেদ করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তার মৃত্যুদন্ড সাংবিধানিক রাজতন্ত্র ও আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই: বিপ্লবে ধসে পড়া রাজতন্ত্রে ১৭৭৪ সালে সিংহাসনে বসা লুই ষোড়শকে দুর্বল রাজা হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আর্থিক সংকট ও অভিজাতদের অনমনীয়তায় তার জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। বিপ্লব শুরু হলে তিনি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র মেনে নেন, কিন্তু পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় ‘বিশ্বাসঘাতক’ হিসেবে পরিচিত হন। ১৭৯৩ সালে ফরাসি বিপ্লবের সময় রাষ্ট্রদ্রোহে দোষী সাব্যস্ত হয়ে গিলোটিনের মাধ্যমে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয় ষোড়শ লুইয়ের। পরবর্তীতে রানি মারি আঁতোয়ানেতও একই যন্ত্রে মৃত্যুদন্ড পান। ইউরোপে রাজতন্ত্রের পতনের প্রতীকী মুহূর্ত এটি। তার মৃত্যুদন্ড ফরাসি বিপ্লবকে আরও চরম পথে ঠেলে দেয়।

নেপোলিয়ন বোনাপার্ট: মৃত্যুদন্ড নয়, নির্বাসনই তার ভাগ্য। ইউরোপ জুড়ে ফরাসি সামরিক আধিপত্য গড়লেও পরাজয়ের পর নেপোলিয়নকে এলবা ও পরে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসিত হতে হয়। অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড হলেও তা কার্যকর হয়নি। ১৮২১ সালে নির্বাসনেই তার মৃত্যু হয়। তার প্রভাব আজও ইউরোপের আইন ও শাসনব্যবস্থায় বিদ্যমান।

মেক্সিকোর সম্রাট ম্যাক্সিমিলিয়ান: বিদেশি শাসনের সমাপ্তি, ফরাসি সমর্থনে ক্ষমতায় আসা অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত ম্যাক্সিমিলিয়ান ফরাসি সেনা প্রত্যাহারের পর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন। ১৮৬৭ সালে রিপাবলিকান বাহিনী বন্দি করে সামরিক আদালতে মৃত্যুদন্ড দেয় এবং মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়। এরপর মেক্সিকোতে জাতীয়তাবাদ ও প্রজাতন্ত্র আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।

ইতালির বেনিতো মুসোলিনি: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৯৪৫ সালের ২৮ এপ্রিল পালিয়ে যাওয়ার সময় ইতালির পার্টিজানরা মুসোলিনি ও তার প্রেমিকাকে আটক করে গুলি করে হত্যা করে। পরে মৃতদেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তারপর ইতালি ফ্যাসিবাদ থেকে সরে প্রজাতন্ত্রের পথে এগোয়। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের প্রতীক হয়ে রয়েছে এ ঘটনা।

হাঙ্গেরির ইমরে ন্যাগি: ১৯৫৮ সালের ১৬ জুন সমাজতান্ত্রিক নেতা ন্যাগিকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৫৬ সালের ব্যর্থ বিপ্লবে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে অনুষ্ঠিত এ বিচারকে ‘শো ট্রায়াল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস ও তার স্ত্রী ইমেলদা মার্কোস: যদিও সরাসরি মৃত্যুদন্ড হয়নি, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন এবং দুর্নীতির অভিযোগে তাদের বিচার হয়।

পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো: জুলফিকার আলী ভুট্টো – দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে আলোচিত বিচার। পাকিস্তানের ক্যারিশম্যাটিক নেতা ভুট্টোকে সামরিক শাসক জিয়াউল হকের আমলে বিতর্কিত বিচারে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে রায়কে নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। তার মৃত্যুর পর পাকিস্তানে বেসামরিক সামরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়। পরে তার মেয়ে বেনজির ভুট্টো দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে ভুট্টোর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে পুনরুজ্জীবিত করেন।

ইরানের আমির আব্বাস হোভেইদা: ইসলামী বিপ্লবের পর ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল ইরানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোভেইদাকে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়। সংক্ষিপ্ত বিচার ও কঠোর পদক্ষেপটি আজও বিতর্কিত।

রোমানিয়ার নিকোলাই চাউসেস্কু: ১৯৮৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর দ্রুত বিচারে গণহত্যা, দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রেসিডেন্ট চশেস্কু ও তার স্ত্রী এলেনাকে গুলি করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। সোভিয়েত ব্লকের পতনের সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনার একটি এটি।

ইরাকের সাদ্দাম হোসেন: ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ইরাকের বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাদ্দাম হোসেনকে দুজাইল গণহত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করে। মার্কিন আগ্রাসনের পর বিশ্বজুড়ে আলোচিত এ বিচার নিয়ে বিতর্ক আজও রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হত্যার ষড়যন্ত্র মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। পাকিস্তানে এ মৃত্যুদন্ড ‘বিচারিক হত্যাকা-’ হিসেবে চিহ্নিত। পতনের পর বিভক্ত ইরাক একনায়কতান্ত্রিক শাসন, যুদ্ধ ও দমনের জন্য বিতর্কিত সাদ্দাম হোসেন মার্কিন আগ্রাসনের পর আটক হন। দুজাইল হত্যাকান্ডে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০০৬ সালে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়। তার পতনের পর ইরাকে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা ও সংঘাত আরও বৃদ্ধি পায়।

কারাদন্ড পাওয়া শীর্ষ নেতারা:

মৃত্যুদন্ড না হলেও অনেক নেতাই ক্ষমতা হারানোর পর কঠোর আইনি পরিণতির মুখোমুখি হয়েছেন-

 নিকোলাস সারকোজি: ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট; দুর্নীতি মামলায় কারাদন্ড। ইংলাক সিনাওয়াত্রা: থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী; অনুপস্থিতিতে ৫ বছরের কারাদন্ড। এহুদ ওলমার্ট: ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী; প্রতারণা মামলায় ২ বছর ৩ মাস। নাজিব রাজাক: মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী; দুর্নীতিতে ১২ বছরের কারাদন্ড। জ্যাকব জুমা: দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট; তদন্তে সহযোগিতা না করায় ১৫ মাস।

উত্থান, পতন পরিণতি:

ক্ষমতার শিখর: এই নেতারা প্রায়শই শক্তিশালী সামরিক বা রাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন, ব্যাপক জনসমর্থন (প্রাথমিক বা কৃত্রিম) আদায় করেন। পতনের কারণ: দুর্নীতি, স্বৈরাচার, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অর্থনৈতিক সংকট এবং জনগণের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তাদের পতনের মূল কারণ। পরিণতি: চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে প্রায়শই সামরিক অভ্যুত্থান, গণ-অভ্যুত্থান বা আদালতের রায়ে কারাদ- বা মৃত্যুদন্ড এসেছে, যা ক্ষমতার চূড়ান্ত অধঃপতনকে নির্দেশ করে। আবার এমনও উদাহরণ আছে, যেখানে মৃত্যুদন্ড নেতার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে শেষ করে দেয়নি; বরং ইতিহাসে তাদের প্রভাব আরো দীর্ঘস্থায়ী করেছে। যেমন ইয়াসির আরাফাত! তিনি মৃত্যুদন্ড থেকে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।১৯৭০-এর দশকে জর্ডানে সংঘাতের জেরে আরাফাতের বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড ঘোষণা হয়। তবুও তিনি পিএলও-এর নেতৃত্ব ধরে রাখেন এবং অসলো চুক্তিতে ভূমিকার জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। এ রায় তাকে রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী করে তোলে। সান ইয়াত-সেন – মৃত্যুদন্ড এড়িয়ে বিপ্লবী এই নেতা কিং সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদন্ড পেলেও সান ইয়াত-সেন বিশ্বব্যাপী সমর্থন জোগাড় করে ১৯১১ সালের বিপ্লবে আধুনিক চীনের পথপ্রদর্শক হন। তিনি প্রমাণ করেন, মৃত্যুদন্ডের হুমকি সবসময় নেতৃত্বকে থামাতে পারে না। মানুষ সাহসীদের নেতা বানায় এবং ইতিহাস দুঃসাহসী নেতাদের স্মরণ রাখে। মৃত্যুই যেনো এই নেতাদের করে তুলেছে বিশ্ববাসীর সমালোচিত এবং আলোচিত।

 রেহানা ফেরদৌসী,সহসম্পাদক, সমাজকল্যাণ বিভাগ, পুলিশ নারী কল্যাণ সমিতি(কেন্দ্রীয় পুনাক),মোহাম্মদপুর, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *