বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনীতির ধ্রুবতারা

সংবাদ তরঙ্গ ডেস্ক: দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন রাজনৈতিক মহাকাশের এক উজ্জ্বল ধ্রুবতারা। তিনি দেশপ্রেমে ভাস্বর হয়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে শুধু আলোকিত করেননি, প্রজ্জ্বলিত করেছেন। তিনি রাজনীতির ধ্রুবতারা হয়ে আমৃত্যু আপোষহীন থেকেছেন, গণতান্ত্রিক পথ দেখিয়েছেন, জনতাও তার নির্দেশিত পথে হেঁটেছে। দেশে গণতন্ত্রমনা যতজন রাজনৈতিক নাবিক রয়েছেন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন তাদের কাছে অথৈ রাজনৈতিক মহাসাগরের এক পথনির্দেশক ধ্রুবতারা। গণতন্ত্রকামিরা তাঁকে আবর্তিত হয়ে সঠিক পথে পাড়ি জমিয়েছেন। পথ হারায়নি, গণতন্ত্রের পথেই থেকেছেন। বেগম জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে সকল অপশক্তি,  পরাশক্তিকে মোকাবেলা করে রাজনীতি করেছেন, কারো সাথে কোন কিছুর বিনিময়ে আপোষ করেননি। দেশের স্বার্থে আমৃত্যু নিজের সিদ্ধান্তে অটল থেকেছেন।

শহীদ প্রেসিডেন্টের জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরেন। যা ছিল গণতন্ত্র পরিপন্থী। সেসময় আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ গণতন্ত্রমনা রাজনৈতিক দলগুলো গণতন্ত্র উদ্ধারে এরশাদ বিরোধী যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলে। সে আন্দোলনে রাজপথের লড়াইয়ে বেগম জিয়া ছিলেন অগ্রভাগের নেত্রী। সেসময় তিনি শুধু বিএনপি’র নেতৃত্ব দেননি কারণবশত আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বেগম জিয়া আওয়ামী লীগের মিছিলেও নেতৃত্ব দিয়েছেন। অগণতান্ত্রিক শক্তিকে পরাজিত করে গণতন্ত্র উদ্ধার করেছেন। এক এগারো’র মইনুদ্দিন ফখরুদ্দিনের সময়ও দেশে দুই বছর গণতন্ত্র ছিল না। ওই সরকার মাইনাস টু ফর্মুলা নামে বেগম খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনাকে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে গণতন্ত্র হত্যার ষড়যন্ত্র করে। সে সময়ও বেগম জিয়া বিদেশে না যেয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কারাবরণ করে গণতন্ত্র রক্ষা করেছেন। বেগম জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে যখনই দেশে গণতন্ত্রের সংকট তৈরি হয়েছে তখনোই তিনি জীবন বাজি রেখে গণতন্ত্রকে আগলে রেখেছেন। তাইতো তিনি আপসহীন গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক নেত্রী।

দেশ এবং দেশের মানুষকে তিনি জীবনের শেষ ঠিকানা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন অন্ত:প্রাণে। দেশের মানুষও তাঁকে মূল্যায়ন করেছেন নিখাদ শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায়। তাঁর মহাকাব্যিক জীবনাবসানের মধ্য দিয়ে তা উপলব্ধি করা যায়। তাঁর মৃত্যুতে সমগ্র জাতি যেমন শোকাতুর হয়েছে তেমনি তাঁর নামাজে জানাজায় শামিল হয়ে বিশ্বের ইতিহাসে শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার এক অমর ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। বেগম জিয়ার বর্ণাঢ্য মহাকাব্যিক রাজনৈতিক জীবন, জীবনাবসান এবং ঐতিহাসিক নামাজে জানাজা নিয়ে দেশ ও বিদেশের গণমাধ্যম তাঁর প্রতি অভূতপূর্ব শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। গণমাধ্যম সমূহের সংবাদ পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে বেগম জিয়ার মহাকাব্যিক জীবনের পাঠ নেয়া যায়। তার আগে বিএনপির ওয়েবসাইট থেকে ঘুরিয়ে আসি।

বিএনপিওয়েব সাইট বলছে; চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া: বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান।বেগম জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় ইস্কান্দার মজুমদার ও তৈয়বা মজুমদারের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে বিভক্তির পর তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তাঁর আদি বাড়ি মূলত দেশের দক্ষিণ-পূর্ব জেলা ফেনীতে। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। জিয়াউর রহমান বীর উত্তম যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখন বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে তার সঙ্গী হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার এবং নেদারল্যান্ডের রানি জুলিয়ানার সাথে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়ার শাহাদাত বরণের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারী সাধারণ সদস্য হিসাবে বিএনপিতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৮৩ সালের মার্চ মাসে দলের ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের পর, খালেদা জিয়া গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক আন্দোলনের সূচনা করেন। তিনি এরশাদের স্বৈরাচারের অবসান ঘটাতে ১৯৮৩ সালে গঠিত সাত দলীয় জোট গঠনের স্থপতি ছিলেন। তিনি ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। যদিও আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) মত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা এরশাদের অবৈধ সরকারকে বৈধতা দেয়ার জন্য জাতীয় পার্টির নেতৃত্বাধীন শাসনের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল। তার দৃঢ় সংকল্পের কারণে, তাঁকে ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়েছিল । তিনি বিএনপির ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে শক্তিশালী একটি সংগঠনে পরিণত করেন যার ফলে তারা সারা দেশে ৩২১টি ছাত্র সংসদগুলোর মধ্যে ২৭০টি জয়লাভ করে । এই ছাত্ররা এরশাদের শাসনের পতনের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৮০ দশকে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে তিনি “আপোষহীন নেত্রী” হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবাধ ও সুষ্ঠু সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন বেগম জিয়া। তার প্রধানমন্ত্রীত্বকালে বাংলাদেশ সংসদীয় গণতন্ত্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার মেয়াদে কিছু বড় অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল। কর্মসংস্থানের হার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এই সময় এবং শুধুমাত্র তৈরি পোশাকশিল্প খাতেই পাঁচ বছরে কর্মসংস্থানের বৃদ্ধি ছিল ২৯%। প্রায় দুই লাখ নারী এই সময় তৈরি পোশাকশিল্প খাতে যোগ দেন। তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি-বণ্টনের সমস্যা উত্থাপন করেন যাতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অংশ পায়। ১৯৯২ সালে তাকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হলে সেখানে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং পরে মিয়ানমার সরকার ১৯৯০ দশকের প্রথম দিকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি করে। ১৯৯৬ সালে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর খালেদা জিয়া টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং পুনরায় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রতিশ্রুতির কারণে, তিনি এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন। যদিও বিএনপি ১৯৯৬ সালের জুনের নতুন নির্বাচনে হেরে যায়, দলটি বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদে সবচেয়ে বড় বিরোধী দল হিসেবে ১১৬টি আসন পায় সেই নির্বাচনে।

১৯৯৯ সালে বেগম জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের সাথে চারদলীয় জোট গঠন করে এবং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি আন্দোলন কর্মসূচি শুরু করে। বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হন। ফোর্বস ম্যাগাজিন নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে ২৯ নম্বরে স্থান দেয়। ২০০৬ সালে, তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে, তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের নির্বাসনে পাঠানোর একাধিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে দুর্নীতির তুচ্ছ এবং ভিত্তিহীন অভিযোগে স্বৈরাচারী সরকার গ্রেপ্তার করে। ক্ষমতায় থাকাকালীন, খালেদা জিয়ার সরকার বাধ্যতামূলক বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের জন্য দশম শ্রেণী পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা, ছাত্রীদের জন্য একটি শিক্ষা “উপবৃত্তি” এবং শিক্ষা কার্যক্রমের জন্য খাদ্য প্রবর্তন করে শিক্ষা ক্ষেত্রে যথেষ্ট অগ্রগতি করেছিল। তার সরকার সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ২৭ বছর থেকে বাড়িয়ে ৩০ বছর করে এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করে। বেগম জিয়া কোনো আসনেই পরাজিত না হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অধিকারী। তিনি ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনগুলোতে পাঁচটি পৃথক সংসদীয় আসনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে, তিনি যে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সেখানে তিনি জয়লাভ করেছিলেন। ২০০৯ সাল থেকে, যখন শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত করে, তখন তিনি গণতন্ত্রের জন্য তার লড়াই নতুন করে শুরু করেছিলেন। সরকার তাকে জোরপূর্বক তার বাড়ি থেকে বের করে দেয় এবং গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন শুরু করায় তাকে দুইবার গৃহবন্দী করা হয়ে। গণতন্ত্রের প্রতি তার ভূমিকার জন্য, তাকে ২০১১ সালে নিউ জার্সির স্টেট সিনেট “গণতন্ত্রের জন্য যোদ্ধা” উপাধিতে সম্মানিত করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ২০১৮ সালে বেগম খালেদা জিয়াকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২০ সালের কান্ট্রি রিপোর্টস অন হিউম্যান রাইটস প্র‍্যাকটিস প্রতিবেদনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট আন্তর্জাতিক এবং দেশীয় আইন বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিল যে, মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবেই তাঁকে সাজা দেয়া হয়েছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে তার “ন্যায্য বিচারের অধিকারকে সম্মান করা হয়নি।”

গণমাধ্যম বেগম জিয়াকে নিয়ে বলছে; খালেদা জিয়া: গৃহবধু থেকে যেভাবে রাজনীতিতে উত্থান হয়েছিল: উনিশশো একাশি সালের ৩০মে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে যখন হত্যা করা হয় তখন খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে তখন ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি তখন বিপর্যস্ত এবং দিশেহারা। জিয়াউর রহমান পরবর্তী দলের হাল কে ধরবেন সেটি নিয়ে নানা আলোচনা চলতে থাকে। বিএনপি নেতারা তখন দ্বিধাগ্রস্ত এবং তাদের মধ্যে কোন্দলও ছিল প্রবল।রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর ভাইস-প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তার অস্থায়ী প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিলেন।মি. সাত্তারের বয়স তখন আনুমানিক ৭৮ বছর।তখনকার রাজনীতিতে মি. সাত্তারকে একজন বৃদ্ধ এবং দুর্বল চিত্তের ব্যক্তি হিসেবে মনে করা হতো।

কারণ তারা জানতেন, মি. সাত্তারের রাজনৈতিকভাবে দক্ষ নন, শারীরিকভাবে দুর্বল।তখন দলের একটি অংশ চেয়েছিল কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্বের কাঠামো ঠিক করা হোক।কিন্তু অপর আরেকটি অংশ, যারা রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারের সরকারে ছিলেন, তারা সেটির বিরোধিতা করেন।প্রয়াত বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তাঁর ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হবার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন।কিন্তু তড়িঘড়ি করে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য আব্দুস সাত্তারের মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হলো। তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এইচ এম এরশাদ চেয়েছিলেন, মি. সাত্তার প্রেসিডেন্ট হোক।বিষয়টি নিয়ে তখনকার বিএনপিতে মতভেদ দেখা দেয়। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি।শেষ পর্যন্ত সেনা প্রধানের ইচ্ছে অনুযায়ী কাজ হয়েছে।মওদুদ আহমদ লিখেছেন, “বেগম জিয়া যদি প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইতেন, তাহলে অন্য কারো প্রার্থী হওয়ার তখন আর প্রশ্ন উঠতো না।”জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিলেন তখন খালেদা জিয়াকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যেত না।খালেদা জিয়া যখন রাজনীতিতে আসেন সেটা অনেককে চমকে দিয়েছিল। সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান তাঁর ‘সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া’ শীর্ষক লেখায় তাঁকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, “জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমান (কোকো)-কে নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।”

রাজনীতির প্রতি অনীহা: বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের বার্ধক্য এবং দল পরিচালনা নিয়ে অসন্তোষের কারণে তৎকালীন বিএনপির একাংশ খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আনার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু রাজনীতির প্রতি খালেদা জিয়ার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে এর কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত; জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁর মনে গভীর দাগ কেটেছিল এবং তিনি মানসিকভাবে সে ধকল কাটিয়ে উঠতে পারছিলেন না। তাছাড়া রাজনৈতিক ভাগ্য তাকে কোথায় টেনে নিয়ে যায় সেটি নিয়েও হয়তো খালেদা জিয়ার মনে চিন্তা ছিল।খালেদা জিয়ার জীবন নিয়ে প্রয়াত সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ ‘বেগম খালেদা জিয়া: হার লাইফ, হার স্টোরি’ বই লিখেছেন। বছর তিনেক আগে যখন তিনি বেঁচে ছিলেন, তখন বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, “জিয়াউর রহমানের আকস্মিক হত্যাকাণ্ড তাঁর মনের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছিল। তিনি হয়তো ভাবতে শুরু করেছিলেন যে রাজনীতি হয়তো মানুষকে এ ধরনের করুন পরিণতির দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। রাজনীতির কঠিন পদযাত্রা সামলাতে পারবেন কিনা সেটি নিয়েও তাঁর মনে প্রশ্ন ছিল। তাছাড়া পারিবারিকভাবে তাঁর পিতা মেয়ের রাজনীতির ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না।এসময় দলের নেতা-কর্মীরা রাজনীতিতে আসার জন্য দিনের পর দিন খালেদা জিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।তিনি দলের হাল না ধরলে দল টিকবে না বলেও অনেকে বলেন। দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য ‘আপোষ ফর্মুলা’ হিসেবে খালেদা জিয়াকে বেছে নেয়া হয়।

অন্যদিকে খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসার বিষয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদের মনে ভয় ছিল বলে উল্লেখ করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।কারণ মি. এরশাদ যেহেতু ক্ষমতা দখলের দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ভাবছিলেন যে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসলে পরিস্থিতি সামলানো তাঁর জন্য কঠিন হয়ে যাবে।সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ ২০১৯ সালের শুরুর দিকে বিবিসি বাংলাকে বলেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে আসার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) আকবর হোসেন, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম শিশু এবং একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী।এছাড়া নজরুল ইসলাম খান এবং জমির উদ্দিন সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে উল্লেখ করেন মাহফুজউল্লাহ।কর্নেল (অব.) আকবর হোসেন পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী হয়েছিলেন।নুরুল ইসলাম শিশু ছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সহচর।এছাড়া একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছেন।মওদুদ আহমদ তাঁর বইয়ে দাবি করেন, খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে সক্রিয় করার ক্ষেত্রে যাদের অবদান ছিল তিনি তাদের মধ্যে একজন। উনিশশো বিরাশি সালের ৭ই নভেম্বর খালেদা জিয়া যখন জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে গিয়ে প্রথম রাজনৈতিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন সেটির পেছনে মি. আহমদের ভূমিকা ছিল বলে তিনি নিজে উল্লেখ করেন।

কর্মী থেকে দলের চেয়ারম্যান: বিএনপি’র ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ১৯৮২ সালের তেসরা জানুয়ারি একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খালেদা জিয়া আত্মপ্রকাশ করেন।সেদিন তিনি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ লাভ করেন।একই বছর ৭ই নভেম্বর জিয়াউর রহমানের সমাধিস্থলে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে খালেদা জিয়া প্রথম বক্তব্য রাখেন।’বিএনপি: সময়-অসময়’ বইয়ে লেখক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন বিএনপিতে যোগ দেবার পর থেকে খালেদা জিয়া বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে হাজির হওয়া শুরু করেন।মি. আহমদ লিখেছেন, ১৯৮২ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার এবং প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের সাথে খালেদা জিয়াও উপস্থিত ছিলেন। উনিশশো বিরাশি সালের ২১শে জানুয়ারি বিএনপি’র চেয়ারম্যান নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করা হয়। দলের মধ্যে তখন এনিয়ে বিভক্তি। দলের তরুণ অংশ চেয়েছিল খালেদা জিয়া দলীয় প্রধান হোক।অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে বিএনপি’র প্রধান হিসেবে দেখেতে আগ্রহী ছিল তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ।বিএনপির চেয়ারম্যান হবার জন্য একইসাথে প্রার্থী হয়েছিলেন খালেদা জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার।বিএনপির ওয়েবসাইটে তখনকার ঘটনা বর্ণনা তুলে ধরে বলা হয়েছে, “এর ফলে এক বিব্রতকর অবস্থার সৃষ্টি হয়। বিচারপতি সাত্তার দুবার বেগম খালেদা জিয়ার বাসায় যান। বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে তরুণ নেতৃত্বের মনোভাবে কথা জানান। এসময় বিচারপতি সাত্তার বেগম খালেদা জিয়াকে দলের সহ-সভাপতির পদ এবং দেশের ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। কিন্তু বেগম জিয়া ব্যক্তিগত কারণে তা গ্রহণ করেননি। অবশেষে বিচারপতি সাত্তারের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর বেগম খালেদা জিয়া চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁর প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নেন।”

উনিশশো বিরাশি সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান এইচএম এরশাদ এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।তখন রাজনীতিতে মি. সাত্তারের আর কোন মূল্য থাকেনি। তাঁর বার্ধক্য, অসুস্থতা এবং নিষ্ক্রিয়তার কারণে দল থেকে তিনি আড়ালে পড়ে যান।মি. সাত্তার আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যান থাকলেও দল পরিচালনায় খালেদা জিয়ার প্রভাব বাড়তে থাকে।উনিশশো তিরাশি সালের মার্চ মাসে খালেদা জিয়া দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং এপ্রিল মাসের প্রথমে বিএনপির এক বর্ধিত সভায় তিনি ভাষণ দেন।কিন্তু তৎকালীন বিএনপির কিছু নেতা সেটি পছন্দ করেননি।বিএনপির সেই অংশটি ভিন্ন আরেকটি জায়গায় বৈঠকের আয়োজন করে।সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালনের কয়েকমাস পরেই খালেদা জিয়া দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন।এ সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় হয়ে উঠেন তিনি।এরপর ১৯৮৪ সালের ১০ই মে খালেদা জিয়া বিএনপির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

মওদুদ আহমদ লিখেছেন, খালেদা জিয়া দলের চেয়ারম্যান হোন এটি সামরিক নেতারা, দুই গোয়েন্দা বিভাগ এবং মন্ত্রীসভার দুই গ্রুপ – কেউ চায়নি। প্রভুদের এবং নিজেদের স্বার্থরক্ষার জন্য প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজ অনেকটা জোর করেই বিচারপতি সাত্তারকে দিয়ে মনোনয়নপত্রে সই করান।খালেদা জিয়া যদি তখন বিএনপির হাল না ধরতেন তাহলে বিএনপি নিঃসন্দেহে গভীর সংকটে পতিত হতো বলে মি. মাহফুজউল্লাহ মনে করেন।এরশাদবিরোধী আন্দোলন যখন ধীরে ধীরে জোরালো হচ্ছিল তখন বিএনপির বাইরে অন্য রাজনৈতিক দল থেকে খালেদা জিয়াকে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছিল।এক্ষেত্রে হায়দার আকবর খান রনো এবং রাশেদ খান মেনন ছিলেন অন্যতম।খালেদা জিয়ার সাথে আলোচনার জন্য তারা দুইজন তাঁর তৎকালীন ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গিয়েছিলেন।মি. রনো তাঁর আত্মজীবনী ‘শতাব্দী পেরিয়ে’ বইতে একথা তুলে ধরেছেন। খালেদা জিয়ার সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করে মি. রনো তাঁর বইতে লিখেছেন, “আমরা খালেদা জিয়ার কাছে প্রস্তাব করলাম, আপনি রাজনীতিতে আসুন, বিএনপির হাল ধরুন, এক্ষেত্রে এরশাদের বিরুদ্ধে লড়ব। এরশাদ সম্পর্কে তার ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু সরাসরি রাজনীতি করবেন কী-না সে সম্পর্কে কিছু বললেন না। দেখলাম, তিনি স্বল্পভাষী, তবে আমাদের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। কোন কথা ঠিক মতো বুঝতে না পারলে, প্রশ্ন করে ভালো করে বুঝে নিচ্ছিলেন। সবশেষে তিনি বললেন, ভেবে দেখব।”

রাষ্ট্র ক্ষমতায় খালেদা জিয়া: উনিশশো আশির দশকে জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে দেশজুড়ে খালেদা জিয়ার ব্যাপক পরিচিত গড়ে উঠে।জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তাতে বিএনপি জয়লাভ করে।রাজনীতিতে আসার ১০ বছরের মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁকে কয়েকবার আটক করা হলেও আন্দোলন থেকে সরে যাননি বিএনপি চেয়ারপারসন।খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক জীবনে যতগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, তার সবগুলোতেই জয়লাভ করেছেন।খালেদা জিয়ার শাসন আমল, ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-২০০৬ — এই দুইভাগে ভাগ করেন অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক।দুই হাজার এক সালে ক্ষমতাসীন হবার পর থেকে খালেদা জিয়ার সরকার একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়ে।সেই বিতর্ক থেকে তাঁর দল ও সরকার আর বেরিয়ে আসতে পারেননি।শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটে।

দুই হাজার আট সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার দল বিএনপির ব্যাপক ভরাডুবি হয়। এরপর থেকে দলটি রাজনৈতিকভাবে আরে ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি।দুই হাজার চৌদ্দ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অনেকটা চাপে পড়ে যায়।খালেদা জিয়ার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এসে হাজির হয় তাঁর বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলা।দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হবার কারণে ২০১৮ সালের ৩০শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারেননি।দেশে-বিদেশে সে নির্বাচন প্রবল বিতর্কের মুখে পড়ে।জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে ২০১৮ সাল থেকে খালেদা জিয়া কারাগারে ছিলেন। দুই হাজার কুড়ি সালে তিনি সরকারের নির্বাহী আদেশে কারাগারের বাইরে আসেন, তবে এজন্য নানা বিধিনিষেধ পালন করতে হয় তাঁকে, যার মধ্যে ছিল- রাজনীতিতে অংশ না নিতে পারা, বিদেশ যেতে না পারা ইত্যাদি।

গণমাধ্যম আরো লিখেছে; তাঁর বর্ণাঢ্য এক রাজনৈতিক জীবন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন তিনি। জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন জননন্দিত সেই নেত্রী—বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলাুমোকদ্দমা, গ্রেপ্তারুকারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—এসব ঝুঁকি রাজনীতিকদের জীবনে থাকে। খালেদা জিয়াও এমন জুলুমুনির্যাতন সহ্য করেছেন। উপরন্তু সহ্য করেছেন স্বামী ও সন্তান হারানোর গভীর শোক আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কঠিন এক পরিস্থিতিতে পড়েন তিনি। দেশ স্বাধীন করার প্রাণপণ লড়াইয়ে যুক্ত হয়ে পড়েন স্বামী জিয়াউর রহমান। দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে সংকটে পড়েন খালেদা জিয়া। এরুওর সাহায্যে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ঠিকানা বদলে বদলে আত্মগোপন করে থাকেন।   ১৯৭১ সালের ২ জুলাই সিদ্ধেশ্বরীর এক বাসা থেকে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করে সেনানিবাসে যুদ্ধবন্দী করে রাখে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দুর্বিষহ দিনগুলো অতিক্রম করতে হয়েছে একাকী (সূত্র: খালেদা: মহিউদ্দিন আহমদ)।পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্বুসংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হতে হয়েছে খালেদা জিয়াকে। বহুকালের অনেক স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাড়ি থেকে তাঁকে উচ্ছেদ করা হয় ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর। গণমাধ্যমের সামনে সেদিন তাঁকে অশ্রুসজল অবস্থায় দেখেছিল দেশবাসী। ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সেনানিবাসের মইনুল রোডের বাড়ি থেকে উচ্ছেদের পর সংবাদ সম্মেলনে এসে কেঁদে ফেলেছিলেন খালেদা জিয়া এমন অজস্র ঘটনায় পরম ধৈর্য, আত্মশক্তি ও আত্মমর্যাদা বজায় রেখেছেন। অনমনীয় দৃঢ়তায় অটল থেকে মাথা উঁচু করে যে জীবন তিনি অতিবাহিত করলেন, তা শুধু বর্ণাঢ্যই নয়। খালেদা জিয়ার এই চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁকে মহৎ চরিত্রগুলোর মতো মহীয়ান করে তুলেছে। সংগত কারণেই এমন মানুষের চিরপ্রস্থানের সংবাদ দেশের জনসাধারণের মধ্যে গভীর শোক ও মর্মবেদনা জাগিয়েছে।

খালেদা জিয়ার শৈশব: খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুরে। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়িতে। তাঁদের তিন কন্যা ও দুই পুত্রের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল খালেদা খানম। দেখতে অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকেরা তাঁকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট জোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চমাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন। খালেদা খানমের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি নিবিড় অনুরাগ ছিল। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। পরবর্তী জীবনে তিনি ফুলের প্রতি এই অনুরাগ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন। তাঁর রাজনীতিও তাঁর নিজের মতো সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। এক জীবনীকার বলেছেন ‘দেশের সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।’

বিয়ে, সংসার: সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের বালুবাড়িতে পৈতৃক বাড়িতে খালেদা খানমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের প্রসঙ্গে তাঁর এক জীবনীকার লিখেছেন, ঘটক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন, ‘আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। পাত্রী এত রূপসী যে, তাঁর রূপের ছটায় সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।’ঘটকের এমন কথা শুনে জিয়াউর রহমান হেসেছিলেন এবং বিয়ে করতে সম্মত হন। বিয়ের পর থেকে খালেদা খানম ‘খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে। বড় ছেলে তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। ছোটজন আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়াতে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০ মার্চ সেনাবাহিনীর বিপথগামী কিছু সদস্যের গুলিতে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বছর বয়সে খালেদা জিয়া অকাল বৈধব্য বরণ করেন।পরিমিত আহার করতেন খালেদা জিয়া। ফল খেতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে নিয়মিত পেঁপের রস পান করতেন। প্রিয় খাবার ছিল সাদা ভাত, সবজি, মসুর ডাল ও মাছ। মাংস খেতেন, তবে তেমন পছন্দের ছিল না। শ্রোতা হিসেবে তিনি বেশ ভালো ছিলেন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। জীবনীকারেরা বলছেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে বিচক্ষণ হয়ে ওঠেন’ (বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম, মাহফুজ উল্লাহ)।

রাজনৈতিক জীবন: মানুষের জীবনে বহু অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ঘটনা ঘটে। খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে যুক্ত হওয়াটাও তেমনই এক অনিবার্য আকস্মিকতার পরিণাম। জিয়াউর রহমান কখনো স্ত্রীকে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করেননি। তাঁর প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই দলের শীর্ষ পদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর বিএনপির চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছরই দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭ দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনুসংগ্রামের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে অনেকেরই পূর্বানুমান ছিল তাঁর বিরোধীপক্ষই বিজয়ী হবে। কিন্তু সেসব অনুমান মিথ্যা প্রমাণ করে বিএনপির বিজয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নহীন করে তোলে। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ নেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

ভোটে কখনো হারেননি খালেদা জিয়া:বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ফেনী, বগুড়া, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর, খুলনা—যেখানেই নির্বাচন করেছেন, সেখানেই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। দেশের নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়াই একমাত্র উদাহরণ, যিনি ৫টি সংসদ নির্বাচনে ২৩টি সংসদীয় আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিটিতে বিজয়ী হয়েছেন।ভোটে হারের গল্প খালেদা জিয়ার নির্বাচনী ইতিহাসে নেই। এমনকি যেসব নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে পারেনি, সেসব নির্বাচনেও তিনি যতটি আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন, তার সব কটিতে জয়ী হন। ১৯৯০ সালে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া বগুড়াু৭, ঢাকাু৫, ঢাকাু৯, ফেনীু১ ও চট্টগ্রামু৮—এই পাঁচ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। পাঁচটি আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। একই সঙ্গে বিশ্বের ইতিহাসে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো নারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৯৬ সালের জুনে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তবে সেই নির্বাচনেও খালেদা জিয়াকে হারাতে পারেননি কেউ। পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতে বিজয়ী হন তিনি। আসনগুলো হলো বগুড়াু৬, বগুড়াু৭, ফেনীু১, লক্ষ্মীপুরু২ ও চট্টগ্রামু১। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনেও খালেদা জিয়া বগুড়াু৬, বগুড়াু৭, খুলনাু২, ফেনীু১ ও লক্ষ্মীপুরু২—এই পাঁচ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে খালেদা জিয়া তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এর আগে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকারে গিয়েছিল বিএনপি। সেই নির্বাচনে ফেনীু১ ও ২, বগুড়াু৭, সিরাজগঞ্জু২ ও রাজশাহীু২ আসন থেকে নির্বাচন করে বিজয়ী হন খালেদা জিয়া। তখন তিনি টানা দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু একতরফা সেই নির্বাচন বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই সংসদেই অবশ্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস হয়। শপথ নেওয়ার মাত্র ১১ দিনের মাথায় পদত্যাগ করেন খালেদা জিয়া। এরপর সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়। ২০০৮ সালে নির্বাচন কমিশন একজনের জন্য সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ নির্ধারণ করায় খালেদা জিয়া বগুড়াু৬, বগুড়াু৭ ও ফেনীু১ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনটি আসনেই বিজয়ী হন তিনি।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহুউপাচার্য (শিক্ষা) দিল রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন প্রথম আলোকে বলেন, খালেদা জিয়া ভীষণ জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আপসহীনতার কারণে দল-মতনির্বিশেষে সবাই তাঁকে পছন্দ করেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে সবাই ধরে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে; কিন্তু সে সময় টিভিতে একটি বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া, যা সব হিসাবুনিকাশ উল্টে দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনি একাধিক আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে প্রতিবারই সব কটি আসনে বিজয়ী হয়েছিলেন। রওশন জিন্নাত আরা নাজনীন বলেন, খালেদা জিয়ার কখনো অসংযত হয়ে কথা বলেননি। ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আচরণ ও কথায় ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব ফেলতেন তিনি। ২০০৮ সালের পর আর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়নি খালেদা জিয়ার। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন বিএনপি বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও আদালত থেকে কারাদণ্ডের রায় থাকায় তার প্রার্থিতা বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ছিল ওই নির্বাচনে, যা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বগুড়াু৭, দিনাজপুরু৩ ও ফেনীু১ আসনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে চেয়েছিলেন। তাঁর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হলেও তার আর ভোট করা হলো না।

মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তম জানাজা বেগম খালেদা জিয়ার: বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা দেশ ও মুসলিম বিশ্বে বৃহত্তম।শুধু বাংলাদেশেই নয়, বরং গোটা মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের এই বৃহৎ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন লাখ লাখ মানুষ। কোনো মুসলিম নারীর এটিই সর্ববৃহৎ জানাজা। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে লড়াই সংগ্রামের জন্য তিনি আপোসহীন দেশনেত্রী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের জন্য গণতন্ত্রের মাতা ও জাতীয় নেত্রী হিসেবে জনগনের ভালবাসায় তিনি সম্মানিত হন।প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ ও লাখ লাখ নেতা-কর্মী জানাজায় অংশ নেন। এ ছাড়া বিদেশি কূটনৈতিকরা এই জানাজায় অংশগ্রহণ করেন।জানাজায় ইমামতি করেন বায়তুল মোকাররমের খতিব। এর আগে, শুধু মানিক মিয়া এভিনিউয়েই নয়, আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে মানুষ অবস্থান নেয় জানাজায় অংশ নিতে। সেখানে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ইতিহাসে কোনো মুসলিম নারীর সর্ববৃহৎ জানাজা। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের স্মরণকালের বড় জানাজা।জানাজার পর, জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নেয়া হয় বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ। লাল সবুজের পতাকায় মোড়ানো লাশ বহনকারী গাড়িটি সকাল সাড়ে ১১টার পর সেখানে প্রবেশ করে। প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন তিনি যে সব বক্তব্য দিয়েছেন, সে সব বক্তব্য জানাজাস্থলে প্রচার করা হয়েছে। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সকাল সাড়ে ১১টার পর পরই  প্রবেশ করেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী গাড়ি। এর আগে এদিন সকাল সোয়া ৯টার দিকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে মরদেহবাহী গাড়িটি তারেক রহমানের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।বিএনপি’র চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কফিনের পাশে বসে কোরআন তিলাওয়াত করেন তাঁর বড় ছেলে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।জানাজায় অংশ নেওয়া মানুষ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া আমৃত্যু দেশের মানুষের অধিকার আদায়ে যে সংগ্রাম করেছেন, আর তাঁর শেষ বিদায়ে লাখ লাখ মানুষের উপস্থিততে ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমুদ্র তাকে কৃতজ্ঞ চিত্তে শ্রদ্ধা জানালো।জানাজায় অংশ নেয়া আলমগীর, আদিব ও সুলাইমানসহ আরও অনেকে বাসসকে বলেন, দেশের ইতিহাসে এটিই কোন জানাজায় বৃহত্তম উপস্থিতি। এটি শুধুই জনসমুদ্র নয়, মহা জনসমুদ্র। তারা আরও বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা কতটা জনপ্রিয় ও ভালবাসার হলে এরূপ হতে পারে, বেগম খালেদা জিয়া সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেলেন। তারা বলেন, দীর্ঘ ৪৫ বছরে তাঁর রাজনৈতিক লড়াই ও অবদান ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। তিনি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেলেন। তারেক রহমান, তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান ও ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা জানাজাস্থলে উপস্থিত হন। বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বেগম খালেদা জিয়ার স্বজনরাও এই গাড়িবহরে ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর স্বামী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন হয়েছে। জানাজা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা ও সেখানে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ২৭ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। আপোষহীন দেশনেত্রী ও জাতীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ইন্তেকালে শোকে স্তব্ধ পুরো বাংলাদেশ।

খালেদা জিয়ার জানাজায় মোট কত মানুষ অংশ নিয়েছেন? বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিয়েছেন প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। জানাজাস্থল, সংযোগ সড়ক ও আশপাশের এলাকার আয়তন এবং জনঘনত্বের ওপর ভিত্তি করে এমন দাবি করছেন জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম। তবে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য জানতে তিনি স্যাটেলাইট ডেটা পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্বে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছে বেগম খালেদা জিয়ার। দেশের ইতিহাসে এমন জনসমুদ্রের জানাজা আগে কখনো দেখা যায়নি। সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউ জানাজার জন্য নির্ধারিত স্থান হলেও মানুষের ঢল ধানমন্ডি ছাড়িয়ে শ্যামলী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। অন্যদিকে খামারবাড়ি থেকে ফার্মগেট-কারওয়ান বাজার পেরিয়ে শাহবাগ পর্যন্ত ছিল শুধু জনস্রোত। ইতিহাসের অবিস্মরণীয় এই জানাজায় মোট কত মানুষ অংশ নিয়েছেন, তা নিশ্চিত হওয়া যায় চারটি বৈজ্ঞানিক উপায়ে; যা কিছুটা সময়সাপেক্ষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘পদ্ধতিগতভাবে দেখলে প্রথমেই বলব টেলিকমিউনিকেশন উপাত্তের কথা—ওইদিন কী পরিমাণ মানুষ ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বা গুগল ম্যাপ ব্যবহার করে সেই তথ্য পাওয়া সম্ভব। এ ছাড়া আমরা স্যাটেলাইট ইমেজ ও ড্রোনের মাধ্যমে জনঘনত্ব প্রাক্কলন করতে পারি।’

ডিজিটাল তথ্য বলছে, সংসদের দক্ষিণ প্লাজা এলাকার প্রায় ৮৭ হাজার ৬৩৬ বর্গমিটার খোলা জায়গায় জানাজার নামাজ আদায় হয়। প্রতি বর্গমিটারে ৮ জন করে দাঁড়ালে এখানে মানুষের সংখ্যা হয় প্রায় ৭ লাখ। মূল জানাজাস্থল ও অন্যান্য খোলা জায়গার বাইরে অন্তত ১৩.৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাতেও জানাজার নামাজ আদায় করা হয়। এসব স্থানে জনঘনত্ব অনেক বেশি থাকায় (প্রতি বর্গমিটারে ৮-১০ জন) শুধু রাস্তাতেই ছিলেন প্রায় ২৫ লাখ মানুষ। এর বাইরেও মিরপুর রোডের অলিগলি ও বাসার ছাদেও অসংখ্য মানুষ জানাজায় অংশ নেন। সব মিলিয়ে জনসংখ্যাবিদদের ধারণা, অন্তত ৫০ লাখ মানুষ এই জানাজায় শামিল ছিলেন। ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম আরও বলেন, ‘যদি ১৩.৪ কিলোমিটার এলাকা বিবেচনায় নেন এবং প্রতি বর্গমিটারে ৮ থেকে ১০ জন মানুষ ধরা হয়, তবে সংখ্যাটি ৪০ থেকে ৫০ লাখের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আপাতদৃষ্টিতে এটিই প্রতীয়মান হচ্ছে।’উল্লেখ্য, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জানাজা হয়েছিল ১৯৮৯ সালে ইরানের ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির, যেখানে প্রায় এক কোটি মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। আর নারীদের মধ্যে খালেদা জিয়ার আগে সবচেয়ে বড় জানাজা ছিল ১৯৭৫ সালে মিশরের সংগীতশিল্পী উম্মে কুলসুমের, যাতে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৪০ লাখ মানুষ

অংশগ্রহণকারীরা যা বলছেন: জনতার স্রোতে শামিল হয়েছিলেন ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিএনপির নেতাকর্মী, সমর্থক ও সাধারণ মানুষ। তাদেরই একজন যাত্রাবাড়ীর আসিফ মাহমুদ। তিনি ছিলেন কারওয়ান বাজার মেট্রো স্টেশনের নিচে জানাজার সারিতে। আসিফ বলেন, কেবল কারওয়ান বাজার মোড় ও এর পাশে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যাই ছিল প্রায় ৩০ হাজার। জানাজায় অংশ নেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মিনহাজ উদ্দিন (৭০)। বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেছেন, কখনোই খালেদা জিয়ার পক্ষে ভোট দেননি। তবে তিনবারের প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানাতেই এসেছেন। মিনহাজ উদ্দিন বলেন, ‘আমি আমার নাতিকে সঙ্গে করে এসেছি, একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদকে শেষ বিদায় জানাতে। যার অবদান চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শোকাহত শারমিনা সিরাজ নামের আরেকজন এএফপিকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন অনুপ্রেরণার উৎস। অদূর ভবিষ্যতে নারীদের নেতৃত্বের আসনে কল্পনা করাও কঠিন।’

মহিউদ্দিন আহমদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া: খালেদা জিয়া ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছেন:স্বজনদের কাছে পুতুল। পোশাকি নাম খালেদা খানম। ক্যাপ্টেন (পরে লে. জেনারেল) জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করে হন খালেদা জিয়া। হন সেনাপ্রধান ও পরে রাষ্ট্রপতির স্ত্রী। নিয়তি তাঁকে টেনে আনে রাজনীতির পিচ্ছিল পথে। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর এক শূন্যতার মধ্যে তাঁর দল বিএনপির হাল ধরেন। আট বছর স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামনের কাতারে ছিলেন। তাঁর হাতেই এলোমেলো হয়ে যাওয়া বিএনপির পুনর্জন্ম ঘটে। খালেদা জিয়ার উত্তরণ হয় গৃহবধূ থেকে রাজনীতিবিদ হিসেবে। আশির দশকে ক্ষমতাসীন এরশাদের অধীন নির্বাচনে যেতে অস্বীকার করেন তিনি। এ জন্য তিনি কয়েকবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দী হন। কিন্তু একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিচালনায় জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে অটল থাকেন তিনি। জনমনে তিনি হয়ে ওঠেন ‘আপসহীন নেত্রী’। আন্দোলন ও ব্যক্তিত্বের মধ্য দিয়ে তাঁর যে সম্মোহনী শক্তি গড়ে ওঠে, তার ওপর ভর করে সব রকমের পূর্বাভাস মিথ্যা প্রমাণ করে ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনে দলকে জিতিয়ে আনেন। তিনি হন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। বলা চলে, একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জিতে আসা দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তিনি। এ অর্জন কখনো কেড়ে নেওয়া যাবে না। তিন মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদের আয়ু ছিল মাস দুয়েক। যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে এসেছিলেন, সেই ব্যবস্থাকে তিনি উপেক্ষা করে সংকটের জন্ম দেন। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একতরফা নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার চেষ্টা ছিল অনভিপ্রেত। বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা মেনে নেন এবং সংবিধানে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনেন। এ ব্যবস্থায় পরপর দুটি নির্বাচন হয়। ইতিহাস খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে? বিএনপির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে এক জনপ্রিয় জেনারেলের হাতে। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটির পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন খালেদা জিয়া। সেই সঙ্গে তিনিও হতে পেরেছেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। মনে হচ্ছিল সংসদীয় গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেবে। কিন্তু সেটি আবারও হোঁচট খায়। পছন্দের লোককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানাতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ান। ফলে আবারও তৈরি হয় রাজনৈতিক সংকট। এ পটভূমিতে সংঘটিত হয় সেনা অভ্যুত্থান, যা এক-এগারো নামে পরিচিতি পায়। রাজনীতি চলে যায় ব্যাকফুটে। খালেদা জিয়া গ্রেপ্তার হন। তাঁর সন্তানেরা হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। তা সত্ত্বেও তিনি এক-এগারোর কুশীলবদের সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাননি। এর মূল্য দিতে হয় তাঁকে।

সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায় ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাঁর দলের হাতে মাত্র ৩০টি আসন গছিয়ে দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ তার মিত্রদের নিয়ে সরকার গঠন করে। এরপর খালেদা জিয়া ধারাবাহিকভাবে ঈর্ষা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হতে থাকেন। এক-এগারোর সময়ের তুচ্ছ একটি মামলায় তাঁকে ফাঁসিয়ে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একসময় মনে হচ্ছিল, তিনি এ জীবনে বুঝি আর মুক্ত আলো-বাতাসে বিচরণ করতে পারবেন না। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। শেখ হাসিনার পতন হয়। তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। ৬ আগস্ট মুক্ত হন খালেদা জিয়া। তিনি ঐক্যের ডাক দেন। ৭ আগস্ট ঢাকায় বিএনপির এক সমাবেশে ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘শান্তি, প্রগতি, সাম্যের ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি। ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।’ তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে নিয়ে তিনি একটিও নেতিবাচক মন্তব্য করেননি। তাঁর এ সৌজন্যবোধ, পরিমিতিবোধ ও উদারতা রাজনীতিতে একটি মানদণ্ড হয়ে থাকবে। খালেদা জিয়া নানা অসুখে ভুগছিলেন। কারাবন্দী হওয়ার পর থেকেই তাঁর শারীরিক জটিলতা বেড়ে যায়। রাজনীতিতে তিনি আর সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেননি। ব্যাধির কাছে একসময় হার মানতেই হলো। বিএনপিতে নানা স্রোতোধারা। আদর্শিক রাজনীতি কেতাবেই বাঁধা পড়ে আছে। দলে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আছে। এত দিন খালেদা জিয়াই ছিলেন দলের ঐক্যের প্রতীক। তাঁর অবর্তমানে দলটির সংহতির বুনন দুর্বল হয়ে যেতে পারে কি না, সেটা দেখার বিষয়। এ চ্যালেঞ্জ বিএনপিকে মোকাবিলা করতে হবে। ইতিহাস খালেদা জিয়াকে কীভাবে মনে রাখবে? বিএনপির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকে এক জনপ্রিয় জেনারেলের হাতে। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে দলটির পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন খালেদা জিয়া। সেই সঙ্গে তিনিও হতে পেরেছেন দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। নিরপেক্ষ সরকারের অধীন কোনো নির্বাচনে কোনো আসনে না হারার এক অনতিক্রম্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। রাজনীতিতে আসার এক দশক পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হয়েছেন। গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এটিও একটি তুলনাহীন অর্জন। এটা বলতে দ্বিধা নেই, এ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার মতো ক্যারিশম্যাটিক নেতা দেশে আর নেই। (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) তাঁর মৃত্যুর ফলে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা কীভাবে পূরণ হবে, সেটি দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ইতিহাসে কেউই অপরিহার্য নন। আবার কেউ কেউ তাঁদের অর্জন ও ব্যক্তিত্ব দিয়ে জনমনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যান। খালেদা জিয়া ইতিহাসে অবশ্যই জায়গা করে নিয়েছেন।

বিশ্বে উল্লেখযোগ্য শেষ বিদায়: গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া বা শেষবিদায়ে সবচেয়ে বেশি জনসমাগমের ঘটনাটি ভারতে। ১৯৬৯ সালে তামিলনাড়ুর প্রথম মূখ্যমন্ত্রী কনজিভরম নটরাজন আন্নাদুরাইয়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জড়ো হয়েছিলেন ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ। আন্নাদুরাই ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন মাদ্রাজের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তাঁর আমলেই রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে তামিলনাড়ু রাখা হয়। তিনি ছিলেন খ্যাতনামা বক্তা ও তামিল ভাষার প্রথিতযশা লেখক। সাহিত্যকর্ম ও রাজনৈতিক ভাষণ তাঁকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমাগমের আরও উদাহরণ পাওয়া যায় হিস্ট্রি ডটকম- এর ওয়েবসাইটে। ২০২৫ সালের ৩১ জানুয়ারি হালনাগাদ হওয়া নিবন্ধে আন্নাদুরাইসহ সাতজন ব্যক্তির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমাগমের তথ্য আছে। তাদের একজন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি।১৯৮৯ সালে খোমেনির মরদেহ কবরস্থানের দিকে নেওয়ার সময় প্রায় ২০ মাইল দীর্ঘ মিছিল তৈরি হয়। যা দেখে ধারণা করা হয় জনসমাগম ছিল প্রায় ১ কোটি। তখনকার জনসংখ্যা বিবেচনায় ওই সমাগম ছিল ইরানের মোট জনসংখ্যার এক-ষষ্ঠাংশ। আয়াতুল্লাহ খোমেনির দাফনের সময়ে ২৫ থেকে ৩৫ লাখ মানুষ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। তবে ওই বিপুল জনসমাগম ভিন্ন পরিবেশও তৈরি করেছিল। মরদেহ বহনকারী সাধারণ কাঠের কফিন ছোঁয়ার জন্য মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে কফিন ও মরদেহ মাটিতে পড়ে যায়। পরে সশস্ত্র রক্ষীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। মরদেহটি একটি হেলিকপ্টারে তুলে সরিয়ে নেওয়া হয়। দাফন প্রক্রিয়া পিছিয়ে ভিন্ন তারিখ নির্ধারণ করা হয়। সেদিনও শোকাহতরা হেলিকপ্টার উড্ডয়নের সময় ল্যান্ডিং গিয়ার আঁকড়ে ধরে ছিলেন।

হিস্ট্রি ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন মারা যান ১৮৬৫ সালে। তাঁর মরদেহ ওয়াশিংটন থেকে ট্রেনে করে নেওয়া হয়েছিল ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে। ওই যাত্রাটি কার্যত একটি চলমান অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া মিছিলে পরিণত হয়। ট্রেনটি পেনসিলভানিয়া, নিউইয়র্ক, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা হয়ে ইলিনয় পৌঁছাতে দুই সপ্তাহ লাগে। এসব অঙ্গরাজ্য অতিক্রমের সময় আনুমানিক ৭০ লাখ মানুষ পথে পথে দাঁড়িয়েছিলেন। ফরাসি ঔপন্যাসিক ভিক্টর হুগো মারা যান ১৮৮৫ সালে। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া উপলক্ষে আর্ক দো ত্রিয়ম্ফ থেকে প্যান্থেয়ন পর্যন্ত শোকমিছিল পর্যবেক্ষণ করেন ২০ লাখের বেশি মানুষ। যা সে সময় প্যারিস শহরের মোট জনসংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। এ ছাড়া, ১৯৫২ সালে ডিউক অব ওয়েলিংটনের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শোভাযাত্রায় দশ হাজারের বেশি মানুষ পদযাত্রায় অংশ নেন। আর যাত্রা দেখতে পথে ভিড় করেছিলেন ১৫ লাখের বেশি মানুষ। রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ দ্বিতীয় জন পলের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অংশ নিতে রোমে জড়ো হয়েছিলেন ৪০ লাখ মানুষ। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলের ফর্মুলা ওয়ান রেসিং কার তারকা আয়রটন সেন্নাকে শ্রদ্ধা জানাতে সাও পাওলোতে জড়ো হওয়া মানুষের সংখ্যা ছিল ৩০ লাখ।

হিসাব কীভাবে হয়: এত লোকসমাগমের হিসাব কীভাবে করা হয়েছিল সে তথ্য গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ও হিস্ট্রি ডটকমের ওয়েবসাইটের নিবন্ধে উল্লেখ নেই। গবেষণাভিত্তিক সংবাদ ও বিশ্লেষণ প্রকাশের প্ল্যাটফর্ম দ্য কনভারসেশন গত ৭ আগস্ট এক নিবন্ধে বলে, ভিড় গণনার একক কোনো নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি নেই। বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন পরিস্থিতির উপযোগী নানা কৌশলের সমন্বয়ে একটি পদ্ধতিগত ‘টুলবক্স’ ব্যবহার করেন। তবে প্রতিটিরই নিজস্ব সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতা আছে। সবচেয়ে পুরোনো এবং একই সঙ্গে সহজ পদ্ধতি হলো ভিড়ের কয়েকটি নমুনা অংশে (আকাশ থেকে তোলা ছবির ভিত্তিতে) প্রতি বর্গমিটারে মানুষের ঘনত্ব অনুমান করা। এরপর সেটিকে গুণ করা হয় জনসমাগম হওয়া মোট এলাকার আয়তনের সঙ্গে। তাত্ত্বিকভাবে এটি সহজ মনে হলেও বাস্তবে এই পদ্ধতি নানাবিধ দুর্বলতা আছে। মানব পর্যবেক্ষক কিংবা অভিজ্ঞদের ক্ষেত্রেও প্রতি বর্গমিটারে দুই, তিন বা চারজন মানুষের পার্থক্য নির্ভুলভাবে বোঝা কঠিন। আরেকটি সমস্য হলো ভিড়ের ঘনত্ব সাধারণত এক সমান হয় না। মানুষ সাধারণত কোনো কেন্দ্রবিন্দুর আশপাশে বেশি জমায়েত হয় এবং অন্য জায়গায় তুলনামূলক ফাঁকা থাকে। ফলে কোনো একটি অংশের হিসাব ধরে পুরো এলাকার ওপর প্রয়োগ করলে একেবারে সঠিক ফলাফল পাওয়া যায় না। অনুমিত সংখ্যা পাওয়া যায়। দ্য কনভারসেশন বলছে, সিসিটিভি ফুটেজ, আকাশ থেকে তোলা ছবি ও ড্রোনের চিত্র ব্যবহার করে ‘ইমেজ প্রসেসিং’ প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিড় গণনা করা যায়। এসব পদ্ধতির মধ্যে আছে, কম থেকে মাঝারি ঘনত্বের ভিড়ের ক্ষেত্রে কার্যকর ‘টেক্সচারভিত্তিক কৌশল’, আবার আলাদা করে মাথা বা শরীর শনাক্ত করতে সক্ষম ‘অবজেক্ট ডিটেকশন মডেল’ও ব্যবহৃত হয়। খোলা জায়গায় যেখানে দৃশ্যমানতা ভালো থাকে সেখানে এসব প্রযুক্তি বেশ নির্ভুল ফল দেয়। তবে ছায়া, অপর্যাপ্ত আলো, বৈরী আবহাওয়ার কারণে ছবি ভালো না এলে হিসাবে নির্ভুলতার হার কমে যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *