সংবাদ তরঙ্গ ডেস্ক: একাত্তরের ১০ জুন ভারতের তিতাস ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে মাকে চিঠিটি লিখেছিলেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর করিম বীর প্রতীক। এই চিঠি লেখার চার মাস পরে এক যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন তিনি।মাকে লেখা শহীদ এই মুক্তিযোদ্ধার চিঠিটা যতোবার পড়া হয়েছে প্রতিবারই চোখ ভিজে এসেছে। আহা তাঁদের অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগ। তিনি তাঁর মা’কে লিখেছিলেন
শ্রদ্ধেয় আম্মা,
আমার শতকোটি সালাম জানবেন। আব্বা ও ভাইকেও আমার সালাম বলবেন। ছোটদের আমার স্নেহ ও ভালবাসা জানাবেন। আম্মা আপনাদের ভিনদেশের অজানা অচেনা জায়গায় ফেলে রেখে চলে গেলাম বলে ভুল বুঝবেন না। আম্মা আপনিতো জানেন যে ভাই যেমন রাজনীতি নিয়ে মাতামাতি করতো, আমি তা করতাম না। রাজনীতি আমার ভাল লাগত না। কিন্তু কি হলো জানি না ২৫ মার্চের সেই ভয়াল রাত্রিতে পাক সেনারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আর পিলখানা ইপিআর ক্যাম্প ছাড়াও সারা ঢাকা শহরে যেভাবে গণহত্যা করেছে, মা বোনদের উপর নির্যাতন চালিয়েছে সে সব খবর আর ছবি দেখে আমার যেন কি হয়ে গেছে। আমি কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিলাম না। আমার কেবলই মনে হচ্ছিল দেশ মাতৃকা আমায় যেন ডাকছে। তার ডাকে সারা দিতেই এ পর্যন্ত ৪ বার মুক্তিযুদ্ধে যাবার জন্য নাম লিখেও যুদ্ধে অংশ নিতে পারছিলাম না। বারবারই আব্বা তার বন্ধু বা পরিচিত নেতা কিংবা আর্মি অফিসারদের সহায়তায় আমার নাম কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। দেশের এ দূর্দিনে দেশের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ যুবকরা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। আর আমি হতভাগা দেশের জন্য কিছুই করতে পারছিনা। দেশের এ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আমার কোনই অবদান থাকবে না। এ আমি ভাবতেই পারি না। দেশবাসীকে আমি মুখ দেখাব কিভাবে?এ ব্যর্থতার শান্তি পাবো কি দিয়ে? তাই বাধ্য হয়েই আপনাদের অজান্তে মুক্তিযুদ্ধে নাম লিখিয়ে ভারতের কোন এক অজানা স্থানে প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য চলে গেলাম। প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে রণাঙ্গণে যাবার পূর্বে যদি সম্ভব হয় তবে দেখা হবে। নয়তো বেঁচে থাকলে যুদ্ধ শেষে অবশ্যই দেখা হবে। আমার জন্য দোয়া করবেন। আম্মা দেশের মাটি যাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে ধরে রাখা যায়? তাই আপনাদের সালাম করেও যেতে পারলাম না বলে মনটা বড়ই কাঁদছে। এ জন্য আমাকে ক্ষমা করে দেবেন। আমার জন্য ও দেশের সকল মুক্তিকামী জনতার জন্য দোয়া করবেন যাতে দেশ মাতৃকার এ দুর্দশা ঘুচিয়ে দেশকে হানাদার মুক্ত করে বীরবেশে দেশে ফিরে আসতে পারি। খোদা হাফেজ।
.ইতি ,আপনার প্রিয় আলমগীর

.চিঠিটি লেখার সময় শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আলমগীর করিম (বীর প্রতীক) ছিলেন ভারতের আগরতলার ‘তিতাস’ মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্পে। মাকে লেখা তাঁর এ শেষ চিঠিটি তাঁর মা ঠিকই পেয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে আসেননি আলমগীর করিম। যুদ্ধের আগে আলমগীর করিম ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজে বিএ তে পড়তেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সী এই মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ শুরুর পর তিন তিন বার মুক্তিযোদ্ধা নির্বাচনে নাম দিলেও বাবা মায়ের তীব্র আপত্তির কারণে যুদ্ধে যেতে পারেননি। কিন্তু যুদ্ধে যোগ দিতে তিনি ছিলেন অনড়। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।
২ নাম্বার সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন আলমগীর করিম। ৫-৭ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার শিমরাইল এলাকায় আলমগীর করিমদের গ্রুপের সঙ্গে পাকিস্তানিদের একের পর এক যুদ্ধ চলছিলো। একবার মুক্তিযোদ্ধারা আগায় তো একবার পাকিস্তানি হানাদার। যুদ্ধের একপর্যায়ে ৭ নভেম্বর পাকিস্তানিরা পিছু হটে। বিজয় নিশ্চিত জেনে মুক্তিযোদ্ধারা উল্লাসে মেতে উঠেন। কিন্তু এই সুযোগে পাকিস্তানিরা ব্যাপক অস্ত্র গোলাবারুদ মজুত করে শক্তি বৃদ্ধি করে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আবার আক্রমণ চালায়। এসময়য় মুক্তিযোদ্ধারা অপ্রস্তুত থাকায় প্লাটুন কমান্ডার পিছু হটার নির্দেশ দেন। তখন আলমগীর করিমসহ বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা সুবিধাজনক অবস্থায় থাকায় ভাবলেন পাকিস্তানিদের উপর তারা অতর্কিত আক্রমণ চালাবেন। এজন্য তারা অ্যামবুশের ফাঁদ ও গড়লেন। পাকিস্তানিরা তাদের উপস্থিতি টের না পেয়ে যখনই অ্যামবুশের অবস্থানে ঢুকে পড়ে তখনই গুলি শুরু করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এসময় বেশীরভাগ পাকিস্তানি সেনাই নিহত হয়। বাকিরা পালাতে শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা অস্ত্রবোঝাই দুটি নৌকা ফেলেও যায়।
.এমন সময় আলমগীর করিম অস্ত্র বোঝাই একটি নৌকা থেকে অস্ত্র নেয়া শুরু করেন। পলায়নরত পাকিস্তানি সেনারা পালানোর সময় গুলি করছিল। তাদের ছোঁড়া একটি গুলিই আলমগীর করিমের বুকে এসে লাগে। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহযোদ্ধা সিদ্দিকসহ মুক্তিযোদ্ধারা। সিদ্দিক পিঠে করে পাশের একটি গ্রামের দিকে রওয়ানা হন কিন্তু তখন আলমগীর করিমের প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছিলো।
.গুলিবিদ্ধ অবস্থাতেই আলমগীর তাঁর সহযোদ্ধাদের বলেছিলেন, যদি তিনি মারা যান, তাহলে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যেন তাঁর মা বা পরিবারের আর কাউকে সে খবর না জানানো হয়। তখন পাশের গ্রামে একজন সেবিকাও পাওয়া গেল। কিন্তু তাঁর কাছে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে আলমগীর করিম নিস্তেজ হয়ে পড়েন। সেদিন সেই গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের শত শত মানুষ আলমগীর করিমকে রক্ত দিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু সে সময় উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় রক্ত দেয়া সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে আলমগীর করিমকে ভারতের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সহযোদ্ধারা। কিন্তু পথিমধ্যেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আলমগীর করিম। পরবর্তীতে আলমগীর করিমকে শিমরাইল স্কুলমাঠে দাফন করা হয়েছিলো। যুদ্ধের মধ্যে আর আলমগীর করিমের সহযোদ্ধারা তাঁর বাবা মাকে তাঁদের সন্তানের শহীদ হওয়ার খবর দেননি। বিজয়ের পর আলমগীর করিমের বাবা মায়ের কাছে গিয়েছিলেন তাঁর সহযোদ্ধারা। শহীদ হওয়ার খবর তাঁর বাবা-মা’র কাছে পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি তাঁরা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন আলমগীর করিমের একটি আংটি ও ব্যবহার্য কাপড়চোপড়।