ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
রাজস্ব জিডিপি অনুপাত হলো একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) তুলনায় সরকার কর্তৃক সংগৃহীত মোট রাজস্বের (কর ও অন্যান্য) অনুপাত, যা অর্থনীতির আকার ও সরকারের আর্থিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বাংলাদেশে এই অনুপাত বর্তমানে (২০২৫ সাল পর্যন্ত) ৭-৮ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করছে, যা দক্ষিণ এশিয়া ও বিশ্ব গড়ের তুলনায় খুব কম। টেকসই উন্নয়নের জন্য ১৫ শতাংশ বা তার বেশি হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটি একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) কত শতাংশ সরকার রাজস্ব হিসেবে আদায় করতে পারছে, তা শতাংশে প্রকাশ করে। এটি সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেট ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার সামর্থ্য বোঝায়। অনুপাত যত বেশি, সরকারের রাজস্ব আয় তত বেশি। বর্তমান অবস্থা: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৬ থেকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে রয়েছে, যা এশিয়া ও বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক কম। টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য এই অনুপাত ১৫ শতাংশ বা তার বেশি হওয়া প্রয়োজন। কারণ অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ কম, কর ফাঁকি এবং করব্যবস্থার দুর্বলতা এই অনুপাত কম থাকার প্রধান কারণ। দক্ষিণ এশিয়ার গড় (১৯.৫ শতাংশ) এবং OECD দেশের গড়ের (৩৩.৯ শতাংশ) তুলনায় বাংলাদেশের অনুপাত অনেক কম। এই কম অনুপাতের কারণে সরকারকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণের ওপর বেশি নির্ভরশীল হতে হয়, বা হচ্ছে।
বাংলাদেশের বর্তমান ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা অনেক আফ্রিকান উন্নয়নশীল দেশের তুলনায়ও কম। উগান্ডার ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ১২ দশমিক ৫ শতাংশ বলেও জানিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান। গত ডিসেম্বর মাসে তিনি সাংবাদিকদের একথা জানান। বাংলাদেশে প্রায় ৬৭ লাখ টিআইএনধারী থাকলেও মাত্র এক-তৃতীয়াংশ নিয়মিত রিটার্ন দাখিল করেন। বিপুলসংখ্যক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভ্যাট নেটের বাইরে রয়ে গেছে। অনেক ধনী নাগরিক বিলাসবহুল জীবনযাপন করলেও রিটার্নে শূন্য বা সামান্য আয় দেখান। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ কর ফাঁকিকে আরও সহজ করে তুলেছে। ফলে সৎ করদাতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন, আর ফাঁকিবাজরা পার পেয়ে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতায় রাজস্ব বাড়াতে শুধু করহার বৃদ্ধি সমাধান নয়। বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি দমন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিকায়নই হলো প্রধান পথ। বিশ্বের অভিজ্ঞতা তাই প্রমাণ করেছে। যেসব দেশ রাজস্ব আহরণে সফল, তারা আগে করদাতার সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং কর প্রশাসনকে স্বচ্ছ করেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতভিত্তিক। অথচ এই বিশাল অংশ কার্যত কর কাঠামোর বাইরে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জটিল করপদ্ধতি ও হয়রানির আশঙ্কায় রিটার্ন জমা দেন না। তাদের জন্য সরল করব্যবস্থা চালু করা জরুরি। মাত্র এক শতাংশ হারে সরল ভ্যাট স্কিম চালু করে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এক পাতার রিটার্ন দাখিলের সুযোগ দেওয়া হলে তারা ধীরে ধীরে করজালে আসতে পারবেন। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ করপদ্ধতি চালু করলে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়।
তবে করজাল সম্প্রসারণই যথেষ্ট নয়, প্রযুক্তি ব্যবহারও অপরিহার্য। বাংলাদেশে দোকানদাররা প্রায়ই বিক্রির রসিদ দেন না। এতে বিপুল ভ্যাট হারায়। প্রতিটি বিক্রয়ে ছজ কোড বা ই-পেমেন্ট বাধ্যতামূলক করলে লেনদেন সরাসরি এনবিআরের সার্ভারে রেকর্ড হবে। ব্যবসায়ীরা আর বিক্রি গোপন করতে পারবেন না। আর ক্রেতার হাতেও থাকবে একটি ডিজিটাল রসিদ। এটি ভবিষ্যতে কর ছাড় বা পণ্যের ওয়ারেন্টির প্রমাণ হিসেবেও কাজে লাগবে। প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন রসিদ নিতে আগ্রহী হবে? আমাদের দেশে রসিদ নেওয়ার অভ্যাস এখনো গড়ে ওঠেনি। এখানেই দরকার প্রণোদনার। ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরে চালু হওয়া Nota Fiscal Paulista প্রোগ্রামের উদাহরণ উল্লেখযোগ্য। সেখানে ক্রেতারা রসিদ নেওয়ার বিনিময়ে ক্যাশব্যাক ও লয়্যালটি পয়েন্ট পেতেন। এর ফলে রাজস্ব আয় প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যায়। বর্তমানে ব্রাজিলে ২০২৫ সাল থেকে নতুন কর কাঠামো (CBS, IBS) কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে ই-ইনভয়েস সিস্টেমে নতুন ফিল্ড এবং যাচাইকরণ প্রক্রিয়া যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ তারা কর ফাঁকি রোধে আরও কঠোরভাবে প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বাংলাদেশও এখান থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
প্রযুক্তি শুধু স্বচ্ছতা আনতেই নয়, কর ফাঁকি শনাক্ত করতেও কার্যকর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্রস-চেক সিস্টেম চালু করা গেলে বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল, ব্যাংক লেনদেন, জমি বা গাড়ির মালিকানা, বিদেশ ভ্রমণ- এসব তথ্য কর রিটার্নের সঙ্গে মেলানো সম্ভব হবে। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর এ পদ্ধতিতে সাফল্য পেয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এআইভিত্তিক অডিট কর প্রশাসনের পক্ষপাত ও দুর্নীতি কমিয়ে স্বচ্ছতা বাড়াতে পারে।
প্রায়ই দেখা যায় অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীর যোগসাজশে বিপুল রাজস্ব হারিয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার কিছু কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য এনবিআরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো জনআস্থা। মানুষ যদি মনে করে কর দেওয়ার অর্থ কেবল দুর্নীতির পকেট ভরানো, তবে তারা কর দিতে অনাগ্রহী হবেন। আবার যদি তারা দেখতে পান কর রাজস্ব দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক বা সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাজ হচ্ছে, তবে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেবেন। এ জন্য রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের তথ্য জনগণের কাছে স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করতে হবে।
সব মিলিয়ে কর আদায়ের টেকসই পথ তৈরি করতে হলে প্রয়োজন একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা। বড় ব্যবসায় ই-ইনভয়েস বাধ্যতামূলক করা, খুচরা লেনদেনে ক্যাশব্যাক চালু করা, কর ছাড়ের ক্ষেত্রে ই-ইনভয়েস শর্ত যুক্ত করা, ঝুঁকিপূর্ণ খাত ডিজিটালি অডিট করা, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য সরল ভ্যাট চালু করা, বড় কর ফাঁকিবাজদের নাম প্রকাশ করা এবং বিদ্যুৎ, গ্যাস ও ব্যাংক হিসাবের তথ্যের সঙ্গে রিটার্ন ক্রস-ম্যাচ করা- এসব বাস্তবায়ন করা গেলে রাজস্ব আহরণ বাড়বে বহুগুণে।
সর্বোপরি, কর আদায় বাড়ানো মানে শুধু রাজস্ব বাড়ানো নয়, বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধ তৈরি করা। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এখন জরুরি একটি অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর ব্যবস্থা। এ পথেই সম্ভব হবে একটি টেকসই উন্নয়নমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা আগামী প্রজন্মের জন্য দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করবে। অর্থনৈতিক কাঠামোতে আনুষ্ঠানিকীকরণ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্থায়ী নীতিগত সংস্কার অপরিহার্য। পাশাপাশি, অন্যান্য উন্নয়নশীল এবং মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে বাংলাদেশে কর সংগ্রহের আধুনিকীকরণ ও করদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো সম্ভব। দেশের কর-রাজস্ব সংগ্রহ ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দু হলো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর। দীর্ঘ দিন ধরে এনবিআর বিভিন্ন কাঠামোগত ও প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের কর সংগ্রহে পূর্ণ ক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছে না। সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এনবিআরকে দুটি পৃথক শাখায় বিভক্ত করা হয়েছে- এনবিআর নীতি এবং এনবিআর ব্যবস্থাপনা। এই বিভাজনের উদ্দেশ্য করনীতি নির্ধারণ ও কর প্রশাসনকে আলাদা করে দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এই বিভাজনের ফলে এনবিআরের প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, নীতিনির্ধারণ এবং বাস্তবায়নের কাজগুলো আলাদা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকায় দ্বন্দ্ব ও জটিলতা কমেছে। কর-জিডিপি অনুপাতের প্রেক্ষাপটে এই বিভাজনের প্রভাব ইতিবাচক এবং দীর্ঘমেয়াদে প্রমাণিত হতে পারে। কারণ নীতি শাখার দ্বারা ধারাবাহিক ও স্থায়ী করনীতি প্রণয়ন সম্ভব হয়েছে, যা করদাতাদের জন্য নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করে। পাশাপাশি ব্যবস্থাপনা শাখার আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ফলে কর সংগ্রহের কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেমন- স্বয়ংক্রিয় রিটার্ন, অনলাইন কর আদায় এবং ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে ট্যাক্স বেস সম্প্রসারণে সহায়তা মিলছে। তবে বিভাজন পুরোপুরি সমস্যার সমাধান নয়।
নীতি ও প্রশাসন শাখার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সংস্থান ও দক্ষ জনবলের অভাব এবং কর সংস্কার বাস্তবায়নে বিলম্ব এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। এই কারণে কর-জিডিপি অনুপাতের তাৎক্ষণিক বৃদ্ধি সীমিত। তবুও দীর্ঘমেয়াদে এনবিআরের বিভাজন কর প্রশাসনের কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কর রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই কাঠামো দেশের কর-রাজস্ব সংগ্রহ জোরদার করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল ও টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিতে পারে। কর-প্রণোদনা ও ছাড় দীর্ঘমেয়াদি কর রাজস্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ভ্যাট, আয়কর, কাস্টমস এবং অন্যান্য কর প্রক্রিয়া সহজ ও যুক্তিসংগত করলে করদাতাদের অংশগ্রহণ বাড়বে। নিবন্ধন, ভ্যাট ও অন্যান্য করের আওতায় আনা হলে কর সংগ্রহ বাড়বে। কর-জিডিপি অনুপাতও ধীরে ধীরে বাড়বে। এ ক্ষেত্রে উন্নত ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর কর সংগ্রহব্যবস্থা এবং নীতি প্রণয়নের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করা যেতে পারে। যেমন- ভারতের জিএসটি, থাইল্যান্ডের কর আধুনিকীকরণ এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের কৌশল বাংলাদেশের জন্য দিকনির্দেশক হতে পারে। কর সংগ্রহ সীমিত থাকলে সরকারের বাজেট ঘাটতি বাড়ে। সরকারকে ঋণ-নির্ভর হতে হয়, যা অর্থনৈতিক চাপ বাড়ায়। কর রাজস্ব কম থাকায় স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমে বিনিয়োগ কমে যায়। এর ফলে দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হয়। প্রায়ই বেসরকারি বিনিয়োগের জন্যও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর-রাজস্ব এবং প্রশাসনিক দক্ষতার অভাব অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে, যা বিনিয়োগ আকর্ষণ কমায়। কর-রাজস্বের অভাবে সরকার ঋণনির্ভর হয় এবং মুদ্রানীতি পরিচালনা কঠিন হয়। দেশের আর্থিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি করে, যা মুদ্রাস্ফীতি এবং বিনিয়োগের অনিশ্চয়তাকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধির জন্য সমন্বিত নীতি, প্রশাসনিক সংস্কার, সামাজিক সচেতনতা ও বৈশ্বিক শিক্ষার সমন্বয় অপরিহার্য। দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিরাপদ ও শক্তিশালী করতে কর-রাজস্ব সংগ্রহব্যবস্থা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শক্তিশালী করা দরকার।
লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান-ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন