ওয়াহিদ জামান
পৃথিবী নামক গ্রহে কার রাজত্ব চলছে? জবাবে বলতে হবে মানুষের। পৃথিবীতে প্রায় সতের লক্ষ প্রজাতি প্রাণীর মধ্যে মানুষ কেন এ গ্রহকে নিয়ন্ত্রণ করছে? কারণ হলো মানুষ অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি বুদ্ধিমান, মানুষের ভাবপ্রকাশের একটা মাধ্যম আছে যেটাকে আমরা ভাষা বলি। মানুষ ছাড়া অন্য জীবের যে বুদ্ধি নেই তা বলা যাবে না। অন্য জীব বা প্রাণীর বুদ্ধি আছে কিন্তু তারা বহুলাংশে মানুষের চেয়ে অসহায়। তার অন্যতম কারণ হলো তাদের ভাষা নেই। মানুষও তার নিত্য জীবনে নানা অসহায়ত্বের ভেতর দিয়ে যায় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মানুষ তার বুদ্ধি দিয়ে তা আবার জয় করতে সক্ষমও হয়। এর মৌলিক কারণ হলো মানুষ ভাষার অধিকারী। এই ভাষায়ই তাকে তার পরিমন্ডলের অন্যান্য মানুষের সাথে সম্পর্ক ¯স্থাপন করতে, পরামর্শ গ্রহন করতে এবং এমনকি তার যে অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি সে বলে, লিখে প্রকাশ করতে পারে। যার ফলশ্রুতিতে মানুষ নানা জটিলতাকে জয় করতে পারে। কিন্তু অন্য জীবের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয় না। মানুষের মতো তাদের বুদ্ধি ও অনুভূতি আছে কিন্তু যোগাযোগ স্থাপনের কোন মাধ্যম তাদের নেই। এদিক থেকে মানুষ স্বয়ংসম্পূর্ণ, তবে সকল ক্ষেত্রে নয়। আধুনিক যুগে মানুষ সারা দুনিয়া ব্যাপী তার মতামত, জ্ঞান ও অর্জন প্রযুক্তির উৎকর্ষে জানাতে পারছে। যার দরুন সমগ্র পৃথিবী তার নিজের, তার আপন নিবাস। যদিও নিদিষ্ট ভূখন্ড ও ভৌগোলিক পরিমণ্ডলে মানুষ তার পরিচয় সীমাবদ্ধ করেছে যা তার নিজস্ব পরিচয়, যাকে আমরা জাতীয়তাবাদ বলি। কিন্তু মানুষ এখন আর সেখানে থেমে থাকেনি। সে তার ভৌগোলিক ও জাতীয় পরিচয়কে অক্ষুন্ন রেখে আন্তর্জাতিকতাবাদে নিজেকে সঁপে দিচ্ছে প্রতিদিন। এ সবকিছু সম্ভব হয়েছে মানুষের বুদ্ধি, বিবেচনা ও অনুভূতিকে সে একটা মাধ্যম দিয়ে তার জাতি ও অন্যান্য অঞ্চলের মানুষ জাতির কাছে খুব সহজে পৌঁছে দেবার সুযোগ পেয়েছে। ফলে পৃথিবীর সকল মানুষই তার আপন মানুষ, সকল মন্যুষ্য জাতি তার আপন জাতি। আমরা যদি মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের দিকে নজর দেই তাহলে দেখবো যে, মানব সৃষ্টির একেবারে শুরুতে মানুষ ও অন্যান্য জীব বা প্রাণীর মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য ছিল না। জীবনযাপন ও খাদ্য সংগ্রহের ধারা বা রীতি একই রকম ছিল। যা আজকের যুগে আমরা বিশ্বাসই করতে পারবো না। আজকের মানুষের যে দৈহিক আকার বা বৈশিষ্ট্য আমাদের আদি মানুষের তেমন ছিল না। বানরসদৃশ কোন প্রাণীর মতো তখনকার মানুষের দৈহিক আতন্কিত এখন যেমন আমরা দু’পায়ে হাটি তারা হাটতো চার পায়ে। দীর্ঘ ঘন লোমে আবৃত ছিল তাদের দেহ। নারী ও পুরুষ উভয়ের শরীর ছিল লোমাবৃত। পুরুষের মতো নারীদেরও ছিল দাঁড়ি। তারা দলবেঁধে চলতো। মানুষ তখনো আজকের মানুষ হয়ে ওঠেনি। আজকের মানুষ হতে মানুষের সময় লেগেছে লক্ষ বছর। পশুরা যেমন দলবেঁধে চলতো মানুষও সেভাবে চলতো। বনেবাদাড়ে পশুরা আজও বাস করে। নানা জীবের বেঁচে থাকা বা বসবাসের পদ্ধতি একেক রকম হলেও তাদের জীববৈচিত্র্যের সরল-সৌন্দর্য একটা নিয়মে বাঁধা। তাদের পারষ্পরিক লেনদেন, বোঝাপড়া, সাহায্য সহযোগিতা সেই আদিম যুগের মতোই আছে। যদিও সময়ের বিবর্তনে জীবন ব্যবস্থায় নানাবিধ পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করি। তার অবশ্য নানা কারণ রয়েছে। মানুষের মধ্যে প্রথম আধুনিকতার ছোঁয়া লাগে আগুন আবিষ্কারের ফলে। আগুন আবিষ্কার মানবজাতির অগ্রযাত্রায় এক যুগান্তকারী ঘটনা। আগুন আবিষ্কার ঠিক কিভাবে হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়। তবে মানুষ নিজে আগুন আবিষ্কার করেনি তা অনেকেই মনে করেন। প্রাকৃতিক দাবানল থেকে মানুষ আগুন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। আগুনই প্রথমে মানুষের লক্ষ বছরের খাদ্যভাস পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। মানুষ যখন আগুনে পোড়া প্রাণীর মাংস ভক্ষণ করে তখন সে এক নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যা তাকে সম্পূর্ণ আলাদা এক জীবসত্তা হিসেবে ভাবতে শেখায়। তখনো মানুষের মধ্যে ভাষার ব্যবহার ঠিক ঐভাবে শুরু হয়নি। পশুরা যেমন নিদিষ্ট কিš‘ আকার ইংগিত বা নিদিষ্ট কিছু ডাক দিয়ে তাদের অনুভূতি বা ভাব প্রকাশ করে মানুষেরও ঠিক যোগাযোগের সেরকম নিদিষ্ট কিছু মাধ্যম ছিল। তাহলে মানুষ কিভাবে ভাষা আয়ত্ত করলো কিংবা মানুষের মুখে ভাষার ব্যবহার কি করে আসলো? মানুষও তো অন্যান্য প্রাণীর মতো আহার গ্রহণ করে, বিভিন্ন সংঘাত ও সংকটের ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হয়, জৈবিক আলোড়ন আছে, তাহলে অন্য জীব বা প্রাণীর ভাষা নেই। অথচ মানুষ ভাষিক প্রাণী। এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা সেভাবে হয়নি কিন্তু যতটুকু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায় সেটি একেবারে অপ্রতুল নয়। মানুষ যে প্রাইমেট বর্গের অধিকারী জীব বা প্রাণী তাদের সাথে মানুষের দৈহিক আকৃতি বহুলাংশে মিলে যায়। কিন্তু নিদিষ্ট কিছু বিষয় মানুষ কে তার বর্গের মধ্যে একেবারে আলাদা করেছে। বিশেষ করে ভাষা অন্যতম। এই একটি বৈশিষ্ট্য মানুষ ভাষিক প্রাণী তার হোমোনিডি পরিবারের মধ্যে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। এখন মানুষের কিছু বৈজ্ঞানিক নাম বিশ্লেষণ করে আলোচনা করলে সুবিধা হবে। মানুষ প্রাইমটে বর্গের কেন? প্রাইমেট হলো স্তন্যপায়ী প্রাণীর একটি ক্রম। মানুষ যেহেতু স্তন্যপায়ী সে কারণে তাকে প্রাইমেট বর্গের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাইমেট বর্গের সকল প্রাণী স্তন্যপায়ী। আধুনিক মানুষ হোমিনিডি পরিবারের হোমিনিন উপপরিবারের একমাত্র বিদ্যমান সদস্য। হোমিনিডি হলো মানব জাতীয় প্রাণীর কালেকটিভ নাম। মানুষ, গরিলা, শিবপাঞ্জি ও বনমানুষের মত মানুষ হোমিনিডি পরিবারের একটি শাখা। এই হোমিনিডি পরিবারের সকল সদস্য ¯’লচর প্রাণী এবং অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল খাড়া অবস্থানও দ্বিপদী। এবং এদের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ভারী জিনিস বহন করতে সক্ষম এবং যোগাযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে এদের সক্ষমতা অন্যান্য প্রাণী তুলনায় সবচেয়ে বেশি। মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম হোমো সেফিয়্যান্স যেটি ল্যাটিন শব্দ। হোমো শব্দের অর্থ মানুষ আর সেফিয়্যান্স শব্দের অর্থ হচ্ছে জ্ঞানী। সুতরাং এই কারণে মানুষ তার বর্গের প্রাণীর চেয়ে জ্ঞানী।মানুষের ( হোমো সেপিয়েন্স) মস্তিষ্কের এমন ক্ষমতা আছে যা প্রাইমেট বর্গের অন্য প্রাণীর মধ্যে পাওয়া যায় না। তার মধ্যে ভাষা ধারণ ও যোগাযোগ স্থাপনে তার সঠিক প্রয়োগ অন্যতম। এখন দেখা যাক মানুষ কেন ভাষা ধারণ করতে পারে তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখা। ১৮৫০ সালে ফরাসী নিউরোসার্জন পল ব্রোকার মানুষের ভাষা ধারণ ও তার প্রয়োগের ব্যাপারে প্রথম ধারণা দেন। তিনি লক্ষ্য করলেন মানুষের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেস্কের একটা স্থান ভাষা তৈরির জন্য দায়ী। পৃথিবীর আর কোন প্রাণীর মস্তিষ্কে এই স্থান বা এলাকা নেই। প্রাইমেট বর্গের বাদবাকি প্রাণীদের মস্তিষ্কে এমন মজবুত ও জটিল এলাকা নেই। যার কারণে মানুষের কাছাকাছি আকৃতি ও কিছু বুদ্ধি-জ্ঞান থাকা সত্বেও মানুষ ছাড়া তার গোত্রভুক্ত অন্য জীব বা প্রাণীর ভাষা নেই। মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেস্কের এই এলাকা বা অংশের নিউরোসার্জন পল ব্রোকারের নামানুসারে ব্রোকা এলাকা নামে নামকরণ করা হয়। মূলত ভাষা মানুষকে জীবকুলে অনন্য উ”চতায় অবস্থান দিয়েছে। অনেকে মনে করেন মানুষ উন্নত চিত্ত ও চিন্তার অধিকারী বলে জধঃরড়হধষ ইবরহম বা বুদ্ধিমান প্রাণী। এ ধারণা ঠিক নয়। মানুষের অন্য প্রাণী থেকে আলাদা হবার অন্যতম
প্রমাণ হচ্ছে ভাষা। প্রচলিত ধারণা হচ্ছে মানুষ তার চিন্তাকে প্রকাশ করে ভাষার মাধ্যমে, এটা ঠিক কিন্তু আগে তাকে ভাষাকে ধারণ করতে হয়েছে। কেননা ভাষা ছাড়া চিন্তা হয় না। ভাষা না থাকলে মানুষ হয়তো মানুষ হতো না, তার বর্গের অন্যান্য প্রাণীর মতো সে পরিচয় বহন করতো। মানুষ যে সামাজিক জীব, সমাজবন্ধনে সে আবদ্ধ তার প্রধান কারণই হ”চ্ছে ভাষা যা আর প্রাণীর নেই বলে মানুষ একমাত্র ভাষিক প্রাণী।