মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল

লিনু হক

‘তোমার আকাশ থেকে আমার জন্য / কেবলই লাবন্য ধরে না /মেঘ জমে শিশিরের ঘাম হয়ে /শিলা ও পাথর জমে মেঘে। বিষ্টির নাম করে/ হাওয়ায় চাদর উড়িয়ে তোমার অস্তিত্বে নামে / নেমে আসে /আমার পাতা ও কাণ্ডের ওপর /পাখির পালক হয়ে স্নিগ্ধতা গড়িয়ে পড়ে /কোন কিছু স্নেহ নয় প্রিয়তা নয় /পাথর গড়িয়ে পড়ে গলে যায়/ তোমার আকাশ থেকে আমার ওপরে  /কোনই লাবণ্য ঝরে না /তবুও  /টিকে থাকি বেঁচে থাকি /বৃষ্টির লবণ একদিন লাবন্য জমবে / আমাদের জীবন শিকড়ে/ তোমার জন্য কবিতা / সমুদ্রগুপ্ত

কোনো একটি দেশে জন্ম গ্রহণ করলেই, সে দেশ নিজের হয়ে যায় না। দেশকে জানতে হয়, ধারণ করতে হয়।  মানুষের যেমন জন্ম পরিচয় থাকে, তেমনি প্রতিটি দেশের, জন্ম পরিচয় আছে। দেশকে ভালোবাসতে হলে দেশকে  জানতে হবে- জানতে হবে, দেশের জন্মের ইতিহাস। ইতিহাস কি? ইতিহাস হলো অতীত বৃত্তান্ত বা কালানুক্রমিক  অতীত কাহিনি ও কার্যাবলীর, লিখন, বিশ্লেষণ ও অধ্যয়ন। আধুনিক কালের প্রখ্যাত ইতালিয় দার্শনিক বেনেদেত্তো  ক্রোস মনে করেন যে, ‘ইতিহাস হলো বর্তমান। অতীত ঘটনাগুলোই বর্তমানে, ইতিহাস হিসাবে পাঠ করা হয়।’

আমাদের দেশের জন্ম ইতিহাস আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিশ্বাস্য সাহস, বীরত্ব ও ত্যাগের  ইতিহাস, বিশাল অর্জনের ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে হলে এর অতীত ইতিহাস জানতে হবে। বদরুদ্দীন  উমর লিখেছেন ‘শুরু থেকেই পাকিস্তান ছিল একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্র। পাকিস্তান দুই শাখার ভৌগোলিক দূরত্ব … সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক জীবন ও ঐতিহ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য… দুই অংশের অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্য ও ক্ষমতার কাঠামোয় ভারসাম্যহীনতা … এই সমস্ত উপাদান, একদম গোড়া থেকে রাজনৈতিক গতিধারা  নির্ধারণ করেছিল, যা যৌক্তিক ও অবধারিতভাবে পাকিস্তানের ভাঙন ও বিভাজন ঘটায়।’

পাকিস্তানের দুই অংশের দুটি বিষয়ে বিশাল ব্যবধান ছিল : প্রথমত ভাষা, দ্বিতীয়ত অর্থনীতি। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ  দখল করার আগে এ অঞ্চল ছিল পৃথিবীর সম্পদের খনি। সারা পৃথিবীর মোট জাতীয় উৎপাদনের ২৫ থেকে ৩০ ভাগ  আসতো ভারতবর্ষ থেকে। গোটা ভারতবর্ষের এক তৃতীয়াংশ সম্পদ ছিল বাংলায়। ব্রিটিশরা ভারত শাসন করে  ভারতের সম্পদ লুটে নিতে থাকে তখন পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম দুর্ভিক্ষগুলো হয় ভারতবর্ষে। সে সময়কালে দুর্ভিক্ষে মারা  গেছে কয়েক মিলিয়ন মানুষ।  ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময়, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গায় ২০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। বাড়িঘর হারিয়ে, বাস্তহারা  হয়েছে দেড়কোটি মানুষ। ধর্মভিত্তিক একটি দেশ গঠনের জন্য ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় সর্বো”চ ভোট দিয়েছিল  পূর্ব বাংলার জনগণ। অথচ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আট মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা  পিতা মোহম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তান সফরে এসে ঘোষণা দেন, ‘উর্দু হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা।’ তৎক্ষণাৎ পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন,  তিনি নিজেও ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের, অথচ তিনি জিন্নাহর ৪৮ সালের কথার প্রতিধ্বনি করলে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক  বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশ ছাত্রদের উপর গুলি বর্ষণ করে। গুলিতে নিহত হয়

রফিক,বরকত, জব্বার ও সালামসহ অনেকে। স্রোতের মত চলতে থাকে এ প্রতিবাদ। অতঃপর ১৯৫৬ তে বাংলা ও  উর্দু উভয় ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার।  একটি জাতির ভাষা সংস্কৃতি,ঐতিহ্যের ওপর নিপীড়ন হচ্ছে বড় নিপীড়ন। ৫২ – র ঘটনাবলী পাকিস্তানের দুই অংশের  মধ্যে ‘তীব্র মনস্তাত্ত্বিক’ ফাটল ধরিয়ে দেয় । ৫২ ভাষা আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের কাছে পাকিস্তানের স্বপ্নভঙ্গের  নিদর্শন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের শহীদের আত্মাহুতি দেয়া স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় আমাদের প্রিয় শহিদ  মিনার। ২১ ফেব্রুয়ারি, এখন শুধু বাংলাদেশের নয় সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

বাঙলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী ষড়যন্ত্র: পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে, পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল সামরিক শাসকদের হাতে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব ক্ষমতাসীন  হওয়ার পর, বাংলাভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানিদের মত প্রেসিডেন্ট আইয়ুব  খান পূর্ব পাকিস্তানের মানুষকে নিচু জাতের বলে মনে করতেন। বাঙালির নিজস্ব ধর্ম-ভাষা-সংস্কৃতি তার কাছে হিন্দু  ধর্মের ভাষা ও সংস্কৃতি মনে হতো। তিনি মনে করতেন বাংলা – উর্দু দিয়ে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করা যাবে না।  তাই তিনি বাংলা ও উর্দু সংমিশ্রিত একটি বর্ণমালা উদ্বোধনের চেষ্টা করেন। শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন জনপ্রিয় ছড়াকে  পরিবর্তন করে। যেমন : ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি ,সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’। ইসলামিকরণ :‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি ,সারাদিন যেন আমি নেক হয়ে চলি।’ আইয়ুব শাসন আমলে বাংলাভাষা সংস্কৃতির মধ্যে ষড়যন্ত্র ছিল- রোমান হরফে বাংলা লেখার চেষ্টা। বাংলা-উর্দু মিশিয়ে  একটি তথাকথিত জাতীয় ভাষা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করে। রেডিও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত কবিতা, প্রচার নিষিদ্ধ  করা হয়। পশ্চিমবাংলা থেকে বই ও চলচ্চিত্র আমদানি নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। আইয়ুব শাসন আমলে ১৯৬২ থেকে  ১৯৬৯ সালের ২৩ মার্চ পর্যন্ত পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মুনায়েম খান। সরকার বেতার- টেলিভিশনে রবীন্দ্র সঙ্গীত  প্রচার নিষিদ্ধ করলে মুনায়েম খান অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল হাইকে ডেকে বলেছিলেন, ‘আপনারা ইসলামি কায়দায় রবীন্দ্র সঙ্গীত লিখতে পারেন না।’ উত্তরে হাই সাহেব বলেছিলেন আমি লিখলে তো হাই সঙ্গীত হবে, রবীন্দ্রসঙ্গীত  হবে না। তাকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ঠাট্টা- মশকরা করে বলতেন বটতলার উকিল। তিনি বিভিন্ন সভায় স্লোগানের  মত করে বলতেন ‘শেখ মুজিবকে আর দিনের আলো দেখিতে দিব না।’ আইয়ুব শাসনকালে সাধারণ মানুষের উক্তি  ছিল : আমরা বাঙালি  ,ভুট্টা খাই না। আটার রুটি কলের পানি,  রাত পোহালে টানাটানি।  এক পোয়া দুধে তিন পোয়া পানি,  আইয়ুব হালার মুসলমানি।

আইয়ুব এর সামরিক শাসন কালে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হলে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছাত্র সংগঠন,  বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে এ সংক্রান্ত তৎপরতা চালায়। ১৯৬১ সালে ঢাকাসহ পূর্ব-পাকিস্তানের বিভিন্ন  স্থানে বিপুল উৎসাহে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হয়। ঢাকা হাইকোর্টের বিচারপতি এস এম মোর্শেদকে সভাপতি  এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক খান সরোয়ার মুর্শিদকে সম্পাদক করে কেন্দ্রীয় রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী  উদযাপন কমিটি গঠিত হয়। ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়ের কার্জন হলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেগম সুফিয়া  কামাল। এ কমিটির উদ্যোগে চার দিন ব্যাপী অনুষ্ঠান উদযাপিত হয়। ঢাকা প্রেসক্লাবে সাংবাদিকরা এ ধরনের  অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এতে করে যে জাগরণের সৃষ্টি হয় তার স্থায়ী রূপ সাংগঠনিক রূপ দেয়ার জন্য ১৯৬১  সালে ‘ছায়ানট’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বিপুল উৎসাহ -উদ্দীপনা ও উৎসবমুখর পরিবেশে ১ লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ পালিত  হয়। ১৯৬৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের উদ্যোগে ২২ থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর ‘বাংলা ভাষা সাহিত্য  সপ্তাহ’ পালন করে। দোকানপাটের নাম ফলক ও গাড়িতে বাংলা নম্বর লেখার অভিযান পরিচালিত হয়।

১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন ছিল স্বৈরশাসক আইযুব খান গঠিত শিক্ষা কমিশনের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন।  পূর্ব পাকিস্তানের শরীফ কমিশনের রিপোর্টের মাধ্যমে শিক্ষা সংকোচনের চেষ্টা করলে সমগ্র পূর্ব-পাকিস্তানে প্রবল ছাত্র  বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ছাত্রসমাজ ৬২ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর শিক্ষা দিবস পালন করে। সেদিন ছাত্র সমাজের উপর নেমে  আসে দমন নীতির স্টিম রোলার। ছাত্রদের মিছিলের ওপর সশস্ত্র বাহিনী গুলি চালালে ওয়াজিউল্লাহ, বাবুল ও  মুস্তাফিজুর শহিদ হন। ৬২-৬৩ ছাত্র বিক্ষোভ ও অসন্তোষ এমন ব্যাপক আকার ধারণ করে যে ঐ বৎসর সর্বমোট ২৭  দিনের বেশি ক্লাস হয়নি। ৬২ শিক্ষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার যুব সমাজের চিন্তার জগতে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দেয়। শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টকে কেন্দ্র করে এই আন্দোলনের বহিঃ প্রকাশ ঘটলেও মূলত এটি ছিল সামরিক আইন  বিরোধী আন্দোলনের অংশ।

৬৪ সালের সাম্প্রতিক দাঙ্গা ও প্রতিরোধ : আইয়ুব বিরোধী গণ বিক্ষোভকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্যে সরকার ১৯৬৪ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ঢাকা ও  তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে পেশাদার অবাঙালি গুন্ডাদের সাহায্যে ভয়াবহ সাম্প্রতিক দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেয়। এই দাঙ্গা  ১০ জানুয়ারি প্রচণ্ড আকার ধারণ করলে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গায় রূপান্তরিত হয়। বাঙালিরা এ দাঙ্গায় রুখে দাড়ায়।  এই দাঙ্গায় হিন্দুদের বাঁচাতে গিয়ে ১৫ জানুয়ারি নবাবপুর রেল ক্রসিং এর কাছাকাছি আন্তর্জাতিক নজরুল ফোরামের  চেয়ারম্যান কবি আমির হোসেন চৌধুরী নিহত হন। ১৬ জানুয়ারি নটরডেম কলেজের অধ্যাপক ফাদার নোভাকে  নৃশংসভাবে হত্যা করে। মোহম্মদপুরে বিহারি গুণ্ডারা ফিজিক্যাল ট্রেনিং কলেজের মেয়েদের হোস্টেলে আক্রমণ করে।

পূর্ব-পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য : পাকিস্তান সৃষ্টির সময় দু’ অংশের মধ্যে পূর্ব বাংলার অবস্থা অপেক্ষাকৃত ভালো ছিল। কিন্তু এ অবস্থা বেশিদিন ছিল  না। ক্রমে ক্রমে দুই অংশের মধ্যে ব্যবধান ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত পাকিস্তানের ১৭ দিনের যুদ্ধের  সময় পূর্ব পাকিস্তান বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। বাঙালিরা নিজেদের অসহায়, অরক্ষিত মনে করে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী সব সময় বলে আসছিল পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের উপর।  এ কথা বলে তারা পূর্ব পাকিস্তানের জন্য কোনো শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থাাকরা – বিশেষ করে সেনাবাহিনীতে  বাঙালিদের নিয়োগ দান কিংবা বাঙালিদের নেতৃত্বেধীন সেনা ইউনিট গঠন কৌশলে এড়িয়ে যায়। কিন্তু ৬৫ যুদ্ধে  পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা কার্যত দৃশ্যমান ছিল না। সে সময় ভারত চাইলে পূর্ব পাকিস্তান দখল করে নিতে পারতো। যুদ্ধের পর বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানায়।  এমতাবস্থায় ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাঞ্জাবি বিরোধী দলের নেতারা লাহোরে এক জাতীয় সম্মেলনের আহ্বান  করেন। ঐ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের জন্য স্বতন্ত্র নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ বাঙালিদের ন্যায্য  স্বার্থের বিষয়ে ৬ দফার দাবিনামা উত্থাপনের চেষ্টা করেন। তখন সম্মেলনে সভাপতি চৌধুরী মোহম্মদ আলী তা  প্রত্যাখ্যান করেন। এবং আলোচ্য সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান। সম্মেলনে নিজের প্রস্তাব উত্থাপনের  সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে শেখ মুজিব সম্মেলন ত্যাগ করেন। এবং ঢাকায় ফিরে এসে বিবৃতি আকারে সংবাদপত্রের  মাধ্যমে তা তুলে ধরেন।

৬ দফা কর্মসূচি ঘোষণার পর বঙ্গবন্ধু অন্য কোনো দলের সমর্থন পাননি। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী পর্যন্ত  ঘোষণা করেন, ‘তাহার দল পাকিস্তানের ঐক্য সংহতির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে গৃহীত কোনো প্রচেষ্টায় শরীক হইবে  না।’ পূর্ব পাকিস্তান কাউন্সিল মুসলিম লীগের সহ সভাপতি ও জাতীয় পরিষদের সদস্য খাজা খয়ের উদ্দিন এবং  সাধারণ সম্পাদক এ কিউ এম শফিকুল ইসলাম ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬ তে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর ছয়  দফা কর্মসূচিকে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘ভয়াবহ পরিণতি সম্পন্ন’ এবং পাকিস্তানের সংহতি জন্য মারাত্মক বলে অভিহিত  করেন। এমন কি বঙ্গবন্ধু নিজের দল আওয়ামী লীগের মধ্যে প্রবীণ নেতৃবৃন্দ কেউ কেউ ৬ দফার ব্যাপারে সন্দিহান  ছিলেন। এদের একটি অংশ পিডিএম (পাকিস্তান ডেমোক্রিটিক মুভমেন্ট) পন্থী আওয়ামী লীগ দাঁড় করানোর চেষ্টা  করেন। বঙ্গবন্ধুর ভরসা ছিল সারাদেশে আওয়ামী লীগের একদল পরীক্ষিত নেতা কর্মী এবং অপেক্ষাকৃত ছাত্র ও যুব  সম্প্রদায়ের প্রতি। তবে সবচাইতে ভরসা ছিল ছয় দফা কর্মসূচির প্রতি। বাঙালি মুক্তির প্রশ্নে ছয় দফাই যে সঠিক  কর্মসূচি এ সম্বন্ধে তাঁর বিশ্বাস দৃঢ় ছিল। তাই তিনি ঘোষণা করতে পেরেছিলেন ‘সরাসরি রাজপথে যদি আমাকে একা  চলতে হয় চলবো। কেন না ইতিহাস প্রমান করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক।’

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগ ঘোষিত ৬ দফা কর্মসূচি : প্রস্তাব -১ , শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি : দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। আইন পরিষদের ক্ষমতা হবে সার্বভৌম এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সর্বজনীন  ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারণের সরাসরি ভোটে। প্রস্তাব -২, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল মাত্র দুটি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।  প্রস্তাব -৩ ,মুদ্রা ও অর্থসমন্ধীয় ক্ষমতা :মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত যে কোনো একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারে : (ক) সমগ্র দেশের জন্য দুইটি পৃথক  অথচ অবাধে বিনিয়োগযোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে।

অথবা  বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্য কেবলমাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন  ফলপ্রসুব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এ ক্ষেত্রে  পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভের পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক ও অর্থ  বিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে। প্রস্তাব-৪ ,রাজস্ব, কর ও শুল্ক সমন্ধীয় ক্ষমতা :ফেডারেশনের অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো রূপ  কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গরাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের  প্রাপ্য হবে। অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির সব রকম করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল  গঠিত হবে।

প্রস্তাব -৫ ,বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা:  (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাষ্ট্রের বহির্বাণিজ্যের পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে।  (খ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে।  (ঘ) অঙ্গ রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্যাদির চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা কর জাতীয় কোনো বাধা-নিষেধ থাকবে না। (ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং সস্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সস্পাদনের  ক্ষমতা দিতে হবে। প্রস্তাব -৬ ,আঞ্চলিক বাহিনী গঠন ক্ষমতা:

আঞ্চলিক সংহতি শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্টগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সরকারি বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার  ক্ষমতা দিতে হবে। ঐ ৬ দফা বাস্তবায়নে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানকে একটি কনফেডারেশনে পরিণত করার  চেষ্টা করেছিলেন যাতে পূর্ব পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক অবস্থার অবসান ঘটে। (সূত্র : আমাদের বাঁচার দাবী ৬ দফা কর্মসূচী, প্রকাশক আব্দুল মমিন, প্রচার সম্পাদক, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ,  ৫১ পুরনো পল্টন, ঢাকা-২) । ছয় দফা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের অর্থনৈতিক শোষণ, বঞ্চনা আর নিপীড়ন থেকে মুক্তির এক অসাধারণ  দলিল। তখন রাজনৈতিক নেতাদের উপর যেরকম অত্যাচার-নির্যাতন চলছিল, সে সময় ৬ দফার মাধ্যমে  স্বায়ত্তশাসনের মতো একটি দাবি তোলা সাহসের বিষয় ছিল। ছয় দফা দাবি উত্থাপনের পর আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ  সারা দেশে ব্যাপক গণসংযোগ করে ছয় দফা মানুষের কাছে তুলে ধরেন। এতে পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব  খান ক্ষুব্ধ হয়ে ছোট বড় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের আটক করে জেলে ভরেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পক্ষের বহুল প্রচারিত পত্রিকা ইত্তেফাক দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষনা করেন এবং  যন্ত্রপাতি বাজেয়াপ্ত করেন।

আইয়ুব সরকার প্রেস এন্ড পাবলিকেশন বিভিন্ন কালাকানুন অরডিন্যান্স (১৯৬৩), বিশ্ববিদ্যালয় অর্ডিন্যান্স (১৯৬৪)  জারি করে। এর আওতায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরকার বিরোধী কার্যকলাপে ব্যব¯’া গ্রহণের  ক্ষমতা পায়। ক্ষমতা বলে তারা বেশ কয়েকজন ছাত্রের ডিগ্রি বাতিল করেন। এতে শিক্ষিত সমাজ প্রচণ্ড ক্ষোভে ফেটে  পড়েন। সংবাদপত্রের কন্ঠ রোধের প্রতিবাদে সাংবাদিক, ছাত্রসমাজ রাজনৈতিক দল সো”চার হয়ে আন্দোলনে শামিল  হন। ১৯৬৬ সালের ২১ জুন ঢাকা চট্টগ্রামের সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের কর্মচারীরা ধর্মঘট পালন করে। সরকার সমর্থিত মর্নিং নিউজ, দৈনিক পাকিস্তান ও দৈনিক আজাদ পত্রিক ছাড়া কোনো পত্রিকা প্রকাশ হয় না। প্রকাশিত এই  তিনটি পত্রিকা হকাররা বিক্রি করেনি। তাঁরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা পত্রিকাগুলো বিক্রি থেকে বিরত থাকেন।

বাক-স্বাধীনতা আন্দোলনের স্লোগান ছিল : *সাংবাদিক মানিক মিঞার মুক্তি চাই। * সাংবাদিকদের আটক করা চলবে না। * সংবাদপত্রের কণ্ঠরোধ – চলবে না ।* ইত্তেফাক –পড়তে চাই * বাক ব্যক্তি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা চাই ।ছয় দফা আন্দোলনের স্লোগান ছিল : *৬ দফা মুক্তির সনদ  * তোমার দফা আমার দফা /৬ দফা ৬ দফা। * পূর্ব বাংলা শোষণ করা চলবে না। * বন্দুক দিয়ে দেশ শাসন চলবে না। * বন্দুক দিয়ে দেশ শাসন করা /চলবে না চলবে না। * পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন /দিতে হবে দিতে হবে। *ছয় দফা মানতে হবে/ নইলে গদি ছাড়তে হবে। * পিন্ডি না ঢাকা/ ঢাকা ঢাকা। পাকিস্তান সমারিক সরকার ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ নামে একটি  রাষ্ট্রদোহ মামলা দায়ের করে, সরকারি কর্মকর্তা, সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান ও অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজনীতিবীদসহ  ৩৫ জনকে অভিযুক্ত করে। তাঁদের গ্রেফতার কর হয়। যেটি ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র’ মামলা হিসেবে পরিচিত। ১৯৬৯  সালের ৫ই জানুয়ারি ছয়দফাসহ ১১ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্য সামনে রেখে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ বাতিল ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্র সংগ্রাম  পরিষদ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মূল স্লোগান ছিল- * তোমার দফা আমার দফা / ১১ দফা ১১ দফা।* ১১ দফার ভিত্তিতে/ আন্দোলন গড়ে তোল। * পূর্ব পশ্চিম একই আওয়াজ / খতম কর আইয়ুব রাজ। * আইয়ুব মোনেম ভাই ভাই / এক দড়িতে ফাঁসি চাই। * জেলের তালা ভাঙবো/ রাজবন্দিদের আনব। * জেলের তালা ভাঙবো/ শেখ মুজিব কে আনব। * তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা। ১৯৬৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দি অবস্থায় আগরতলা ষড়যন্ত্রের মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট ফজলুল হক, ফ্লাইট সার্জেন্ট জহুরুল হককে গুলি করে। ঐ দিন রাত ৮ টা নাগাদ চতুর্দশ ডিভিশনের পক্ষ থেকে বলা হয় প্রহরীকে নিরস্ত্র  করে পলায়নের চেষ্টা কালে তাঁরা গুলিবিদ্ধ হন। তাঁরা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। পরের  দিন ১৬ ফেব্রুয়ারি সার্জেন্ট জহুরুল হকের হাসপাতালে মৃত্যু হয়। ১৬ ফেব্রয়ারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্র  সংগ্রাম পরিষদের একটি বিশাল মিছিল জহুরুল হকের এলিফেন্ট রোডের ‘চিত্রা’ বাড়িতে গিয়ে উপস্তিত হয়। সেখান  থেকে তাঁর মরদেহ নিয়ে এক বিরাট শোক মিছিলসহ পল্টনে উপস্তিত হন। সেখানে হাজার হাজার জনতা তাঁর  জানাজায় উপস্তিত হন। জানাজা শেষে, তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। জহুরুল হকের মৃত্যুর সংবাদে আতাউর রহমান ওসমানীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা জানাজায় উপস্তিত হন। এরপর মওলানা ভাসানী ও  ছাত্রলীগের নেতা তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে  উঠে।

সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার কারণ জনতা ক্রোধে এতটাই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল যে তারা মুসলিম লীগ নেতা  শাহাবুদ্দিন ও খাজা হাসান আসকারির বাড়িতে এবং সরকার সমর্থিত পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং  নিউজ পত্রিকা অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়। বর্তমান বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজ তখন সরকারি রেস্ট হাউজ  ছিল। সেখানে আগরতলা মামলার প্রধান বিচারপতি এস এ রহমান থাকতেন। ক্ষুব্ধ জনতা বাড়ির উপর চড়াও হলে  তিনি পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান এবং আদালতের কার্যক্রমস্থগিত করে পাকিস্তান চলে যান। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক সামসুজ্জোহা যিনি সক্রিয় রাজনীতি করতেন না,  তিনি তাঁর ছাত্রদের ভালোবাসতেন, দেশকে ভালোবাসতেন তাঁর বিবেকের দায়বদ্ধতার কারণে কর্তব্য পালন করতে  এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সংঘাত এড়ানো। তাই তিনি ছাত্রদের ফিরিয়ে  আনতে এগিয়ে যান এবং সশস্ত্র বাহিনীর একজন কর্মকর্তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁকে কোনো কথা  বলার সুযোগ না দিয়ে বেয়নেটের আঘাতে তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের

মানুষকে মেধা শূন্য করে দেয়া। সামসুজ্জোহা ছিলেন তাদের পরিকল্পনার প্রথম শহিদ। এ খবর দেশবাসীর মধ্যে  ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন আরও নতুন মোড় নেয়। সন্ধ্যায় ঢাকায় খবর এসে পৌঁছালে হাজার হাজার মানুষ সান্ধ্য  আইন ভঙ্গ করে রাস্তায় নেমে আসে। বিক্ষোভরত মানুষকে জেল-জুলুম, পুলিশ ইপিআর দিয়ে গুলি করেও পাকিস্তান  জান্তা মানুষের বিক্ষোভ থামাতে পারে না । এ আন্দোলনে প্রাণ দিয়েছিল নবকুমার ইনিস্টিউটের দশম শ্রেণির ছাত্র  মতিউর, রুস্তমআলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ- যার নামে নামকরণ করা হয়েছে মোহম্মদপুরের আসাদ  গেটের। আন্দোলনের মুখে পাকিস্তান সরকার শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবসহ সকল নেতাকে ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি  মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। শুধু তাই নয় পরাক্রমশালী আইয়ুব খান ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া  খানকে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় হন। জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় এসেই পাকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচন দেবার ঘোষণা করেন। তারিখটি  ছিল ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। নির্বাচনের কিছুদিন আগে ১২ নভেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় একটি প্রাকৃতিক  দুর্যোগ ঘটে… এক প্রলয়ঙ্করী ঘুর্ণিঝড়ে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। এত বড় একটি ঘটনায় পাকিস্তান সরকার  যেভাবে সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে আসার কথা তারা সেভাবে এগিয়ে আসেনি। ঘূর্ণিঝড়ের পর যারা কোনো রকম বেঁচে ছিলেন তাঁদের অনেকে খাদ্য ও পানির অভাবে মৃত্যু-মুখে পতিত হয়। ঘূর্ণিঝড়ে কষ্ট পাওয়া মানুষের চরম  অমানবিক অবস্থায় পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের প্রতি বিতৃষ্ণ ও বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। প্রচণ্ড ক্ষোভে  মওলানা ভাসানী একটি সভায় প্রকাশ্য স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের ঘোষণা দিয়ে বসেন।

১৯৭০ সালে ৭ ডিসেম্বর সারা দেশে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। পাকিস্তান জান্তা মনে করেছিল  এ নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল একক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ১৯৭০-এর ৮ ডিসেম্বর রাত তিনটা —  ইয়াহিয়া খান সারা রাত টেলিভিশনের সামনে বসে নির্বচনের ফলাফল দেখছিলেন। তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।  ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলর জেনারেল উমরের কাছে চেঁচিয়ে কৈফিয়ত চাইলেন ‘কী হচ্ছে এই সব? কোথায়  গেলো তোমার হিসাব নিকাশ?’ সর্বশেষ হিসাবে পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২ আসনের ১৬০টিতে ছিল আওয়ামী লীগ জয়ী।  পশ্চিমে ১৩৮ আসনের মধ্যে পিপিপি পেয়েছিল ৮১ টি যাতে ছিল পাঞ্জাবের ৮২ টির মধ্যে ৬২ টি। সিন্ধু প্রদেশের  ২৭ টির মধ্যে ১৮ টি এবং উত্তর- পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ২৫ টির মধ্যে ১ টি। সামরিক নেতৃত্ব আশা করেছিল, ভোটাররা মিশ্র রায় দিবে। তারা মনে করতেন জাতীয় সংসদ ভাগাভাগি হলে ১২০  দিনের মধ্যে সংবিধান প্রণয়নের কাজটি অসম্ভব হবে। আর তাতে আবার নির্বাচনের প্রয়োজন হবে। সামরিক আইন  প্রশাসকের এক সদস্য তার স্মৃতিচারণে বলেন, ‘তারা মনে করেছিল এই প্রক্রিয়া অনির্দিষ্টকাল চলবে, যার ফলে

সামরিক আইন চালু থাকবে। অথবা বিকল্প রাজনৈতিক নেতারা সামরিক শাসকদের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য  হবে।’ আওয়ামী লীগের শক্তি কমানোর জন্য গোয়েন্দা বিভাগ (আইবি) আর এমএসসিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।  আপন স্বপ্নে বিভোর জেনারেলরা বিশ্বাস করতো নির্বাচনের ফল তাদের পরিকল্পনা মাফিক হবে। আওয়ামী লীগের বিস্ময়কর ফলাফলে ক্ষমতাসীনরা হতভম্বহয়ে গিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া আর তার সহকর্মীরা বিশ্বাস  করতেন যে নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দৃশ্যপট পাল্টে যাবে, আওয়ামী লীগ কর্মসূচি নিয়ে আর এগিয়ে যেতে পারবে  না। সামরিক গোয়েন্দারা ইঙ্গিত দিয়েছিল শেখ মুজিবের লক্ষ্য স্বাধীনতা। ছয় দফার সাংবিধানিক এবং অর্থনৈতিক  পরিণতি কি হতে পারে তার কিছু স্মারক তৈরি করা হয়েছিল কিš‘ তা সামরিক প্রশাসকের ফাইলবন্দি হয়ে ছিল।

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নির্বাচন-উত্তর ৩ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহবান করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের  হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার শুরুতেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে পুনরায় শুরু হয় ষড়যন্ত্র। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের  সঙ্গে যুক্ত হয় সামরিক বাহিনী ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো। তারা কোনো অবস্থাতেই  পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে আগ্রহী ছিলেন না। নানা অজুহাত দেখিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় জটিলতা  সৃষ্টি করছিল। জুলফিকার আলী ভুট্টো ঘোষণা করেন যে, তিনি ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অধিবেশনে যোগদান  করবেন না। তিনি ছয় দফার পুনর্বিন্যাসের দাবি জানান এবং এ ক্ষেত্রে ভারতের ষড়যন্ত্র কথাটি যুক্ত করে পরিস্থিতি  ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন। এ সকল অজুহাতে প্রসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ইন্ধন যোগান। ১৯৭১ সালের  পহেলা মার্চ ১.৫ মিনিটে তিনি আকস্মিক এক বেতার ভাষণে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য ¯’গিত  ঘোষণা করেন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ¯’গিত হয়ে গেছে, এ ঘোষণাটি যখন রেডিওতে প্রচার হয় তখন ঢাকা স্টেডিয়ামে  পাকিস্তানের সাথে কমনওয়েলথ একাদশের খেলা চলছে। মুহূর্তে জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে, খেলা পণ্ড করে, প্যান্ডেল পুড়িয়ে  দিয়ে মাঠ থেকে বেরিয়ে আসে, ঢাকা স্টেডিয়াম হয়ে উঠে রণক্ষেত্র। স্কুল- কলেজ, অফিস- আদালত, দোকান-পাট,  সব বন্ধ হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে আসে, মানুষের মুখে উ”চারিত হতে থাকে, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো  বাঙলাদেশ স্বাধীন কর।’ ‘ জয়বাংলা।’

১ লা মার্চ ঐ দিন বেলা তিনটায় আওয়ামী লীগের গণপ্রতিনিধিদের একটি সভা ছিল হোটেল পূর্বাণীতে। উত্তেজিত  জনতা লাঠি-সোটা হাতে পূর্বানী হোটেল সম্মুখে উপস্থিত হয়। পরিস্থিতি ছিল তুমুল উত্তেজনাপূর্ণ। বাইরে জড়ো  হয়েছিল শত শত বিদেশি সাংবাদিক। দলীয় নেতা পরিবেষ্টিত শেখ মুজিব ৩.২০ মিনিটে উপস্তিত হয়ে ঘোষণা  করলেন, ‘কেবল সংখ্যালঘু দলের ভিন্নমতের কারণে শাসনতন্ত্র প্রণয়নের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়া হয়েছে এবং জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা জনগনের  সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের প্রতিনিধি এবং আমরা এটা বিনা চ্যালেঞ্জে যেতে দিতে পারি না।’ শেখ মুজিব অসহযোগ  আন্দোলনের ঘোষণা দিলেন এবং পরবর্তী ৬ দিন আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করলেন। ২রা মার্চ ঢাকায় হরতাল, ৩রা মার্চ সারা দেশে হরতাল ও ৭ মার্চরেসকোর্স ময়দানে বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ঘোষণা দেন।  ঐতিহাসিক ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন চত্ত্বরে, স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আহুত প্রথম  বিশাল ছাত্র জনসভায় সভাপতিত্ব করেন – নূরে আলম সিদ্দিকী। সভায় বক্তব্য রাখেন জনাব আসম আব্দুর রব, শাজাহান সিরাজ ও আব্দুল কুদ্দুস মাখন। লাখো ছাত্র-জনতার এই সভাতেই প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা তুলে ধরেন  আসম রব, ( যে পতাকা তৈরি হয়েছিল ৬ই জুন ১৯৭০ সালে), পাশে মঞ্চে দণ্ডায়মান ছিলেন শাজাহান সিরাজ, মঞ্চে  উপবিষ্ট ছিলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, আব্দুল কুদ্দুস মাখনসহ ছাত্রলীগের নেত্রীবৃন্দ। এই সভা থেকে ঘোষণা হয় ৩রা  মার্চ পল্টন ময়দানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।  ঐতিহাসিক ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহুত ছাত্র সভায় আকস্মিকভাবে  উপস্তিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ সভাতে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সভায় স্বাধীনতার  ইশতেহার পাঠ করেন-শাজাহান সিরাজ। ইশতেহার তৈরি করেছিলেন ২ রা মার্চ দুপুরে, আসম আব্দুর রবের কক্ষে,  তৎকালীন ইকবাল হলে। শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান ইশতেহার তৈরি করেন, খসড়া তৈরিতে  সহযোগিতা করেছিলেন রায়হান ফেরদৌস মধু। ইশতেহারের মূল বিষয় ছিল : ১.বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান। ২.বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হবেন স্বাধীন বাংলাদেশের মহান নেতা। ৩. গাড় সবুজের জমিনের উপর (ইড়ঃঃষব এৎববহ) লাল সূর্য এবং লাল সূর্যের উপর বাংলাদেশের সোনালী মানচিত্র সম্বলিত  জাতীয় পতাকা। ৪. জাতীয় সঙ্গীত হবে “ আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।” ৫. গনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি। ৬. বাংলাদেশের মানচিত্র অনুযায়ী ৫৪,০০০ বর্গমাইল এই দেশকে শত্রু মুক্ত করতে হবে। ৭. সশস্ত্র বাহিনীর সকল বাঙালি সেনাদের, ইপিআর, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীকে জনগণের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধে  অংশগ্রহণ করতে হবে। ৮. শ্রমিক-কৃষক,কবি- সাহিত্যেক,গায়ক,গায়িকা,সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, সরকারী বেসরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সকল  শ্রেণির মানুষের সমন্বেয়ে সংগ্রাম কমিটি করাসহ একটি পূর্নাঙ্গ কমিটি গঠন। এই ইশতেহার এর মধ্য দিয়ে কেবল স্বাধীনতা সংগ্রামের কর্মসূচি ঘোষণা হয়নি বরং প্রতিটি বিষয় পল্টনে ময়দানে  উপস্তিত জনতা হাত তুলে সমর্থন করেন। সভায় শপথ বাক্য পাঠ করা হয় এবং ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সঙ্গীত  গাওয়া হয়।

৭ই মার্চ জনসভাতে দলের অবস্থা বিবেচনার জন্য ৬ ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির  বৈঠক ডাকা হয়। সারা দেশের মানুষ প্রত্যাশা করেছিল ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিবেন। বিশেষ করে ছাত্র,  যুব সমাজ এ ঘোষণার পক্ষে ছিল। দলীয় সদস্যরা বুঝতে পেরেছিল, কেবল স্বাধীনতাই একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান।  ছাত্র সমাজ, যুব সমাজ, রাজনীতি সচেতন জনগণের প্রত্যাশা ছিল স্বাধীনতা। এ ক্ষেত্রে দায়িত্বভার ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ  মুজিব ও তাঁর দলের। ৭ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষনার অর্থ ছিল, পাকবাহিনীর সকল শক্তি নিয়ে বাঙালিদের উপর ঝাঁপিয়ে  পড়ার সুযোগ করে দেয়া। কোনো নিরস্ত্র জনগণ এ ধরনের হামলায় জয়ী হতে পারে না। তাছাড়া বর্হিবিশ্বে এর  প্রতিক্রিয়া কি হবে? তারা কি বাংলাদেশ কে স্বীকৃতি দিবে? অজস্র প্রশ্নের মধ্যে এগুলো ছিল বিশেষ বিবেচ্য বিষয়।  বঙ্গবন্ধু সবার মতামত শুনলেন কিন্তু নিজের মতামত প্রকাশ করলেন না। যাবতীয় মতামত বৈঠকে প্রকাশ হল। ৭ মার্চ সকালে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ড শেখ মুজিবের সাথে সাক্ষাৎ করেন। জি ডাব্লুউ চৌধুরী ফারল্যান্ড মুজিবের  সাক্ষাৎকার সম্পর্কে বলেন, ফারল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি তুলে ধরে বি”িছন্নতাবাদী, (স্বাধীনতা) এই খেলায় মার্কিন  যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে শেখ মুজিবকে কোনো প্রকার সাহায্য না করার কথা পরিস্কার জানিয়ে যান। ‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মত দীপ্ত পায়ে হেঁটে ।অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন ।তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,  ।হৃদয়ে লাগিল দোলা,জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? গণসূর্যর মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন ।অমর কবিতা খানি: এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের :নির্মলেন্দু গুণ।

৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণ দিতে  এলেন। ততদিনে পুরো পূর্ব-পাকিস্তান চলছে বঙ্গবন্ধুর কথায়। লক্ষ লক্ষ লোক ভাষণ শুনতে বসেছেন। রেসকোর্স  ময়দান জনসমুদ্র। ভাষণটি ছিল ১৯ মিনিটের, ভাষণের মূল বাক্য ছিল “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম এবারের  সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে  পড়বে।” অবিলম্বে সামরিক শাসনের অবসান এবং নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা প্রদানের সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরা হল। চুড়ান্ত লক্ষ্য স্থির হলো স্বাধীনতা। বঙ্গবন্ধু একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণা থেকে বিরত থাকলেন। কেন না  সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তারা স্থন নিয়ে ফেলেছে, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে তৎক্ষণাৎ তারা আক্রমণ করবে। উল্লেখ্য ৬ মার্চ রাতে ইয়াহিয়া খানের একটি বার্তা নিয়ে এসেছিলেন  একজন ব্রিগেডিয়ার বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে। বার্তা ছিল ইয়াহিয়া খুব শ্রীঘ্রই ঢাকা আসবেন এবং একটি মীমাংসা  করবেন তাতে বাঙালিরা সš‘ষ্ট থাকবেন। এটা ছিল বিশ্বকে দেখানোর জন্য চাতুর্যপূর্ণ প্রস্তাবের মাধ্যমে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে প্রভাবিত করার কৌশল। শেখ মুজিব আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দেয়ার ক্ষেত্রে এটি একটি বিবেচ্য বিষয় ছিল। বঙ্গবন্ধু ৭ ই মার্চের ভাষণ ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল একটি ঐতিহাসিক ভাষণ। এই ভাষণ দেশের  সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অকাতরে প্রাণ দিয়ে দেশকে স্বাধীন করার শক্তি যুগিয়ে  ছিল।

৭ই মার্চ ৭১ এ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর স্লোগান ছিল – *জয় বাংলা  *ঘোষণা কর ঘোষণা কর/ স্বাধীনতা ঘোষণা কর। * বীর বাঙালি অস্ত্রধর / বাংলাদেশ স্বাধীন কর। *মা বেনেরা অস্ত্র ধর / বাংলাদেশ স্বাধীন কর। * গ্রামে গ্রামে দূর্গ গড় / বাংলাদেশ স্বাধীন কর। * স্বাধীনতা বাংলার মহান নেতা /শেখ মুজিব শেখ মুজিব।  * জিন্না মিঞার পাকিস্তান/ আজিমপুরের গোরস্থান।  জেনারেল ইয়াকুব খান পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন। তাকে সরিয়ে টিক্কা খানকে গভর্নর করা হল। কিš‘ তিনি  শপথ নিতে পারলেন না। হাইকোর্টের বিচারপতিরা বঙ্গবন্ধুর ডাকে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। টিক্কা খান গভর্নর হতে পারল না। এমনি অবস্থায় ১৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করলেন তিনি বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনের  দায়িত্ব নিচ্ছেন এবং বেসামরিক জনজীবন পরিচালনার জন্য ৩১ টি নির্দেশ জারি করেন। তিনি সেনাবাহিনীর চলাচল প্রতিহত করার জন্য সংগ্রামী জনতাকে উদাত্ত আহবান জানান। একই সঙ্গে তিনি প্রাক্তন সেনাবাহিনী, ছাত্র-বিগ্রেড  সংগঠিত করেন এবং কর্নেল (অবঃ) ওসমানীকে ডিফ্যাক্টো কমান্ডার ইন চীফ নিযুক্ত করেন। মুজিবের নির্দেশে  কর্নেল(অবঃ) ওসমানী, পুলিশ, ইপিআর, ইস্টবেঙ্গল ব্যাটেলিয়নানের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে থাকেন। ১৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসেন। মুজিব পূর্বেই এই ‘অতিথিকে’ বিড়ম্বনা হতে বাঁচানোর জন্য ফার্মগেট চেক  পয়েন্ট থেকে তুলে নেন। প্রকাশ্য জনতার সামনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে বাংলাদেশের একজন অতিথি হিসাবে তিনি  স্বাগত জানান। ১৬ মার্চ মুজিব-ইয়াহিয়া একান্ত আলোচনা এবং ১৭ই মার্চ আনুষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ আলোচনা শুরু হয়। ঐ  দিন সন্ধ্যায় জেনারেল টিক্কা খানকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বলেন, ‘মুজিব সঠিক আচরণ করছে না। তুমি তৈরি হও।’  ১৮ মার্চ শ্রমিকদের উপর সেনা হামলা হয়। সকালে সেনা সদস্যরা তেঁজগা, মহাখালীতে নিরীহ ট্রাক চালকদের উপর  হামলা চালায়। তাদের নির্মম ভাবে প্রহার করে, টাকা পয়সা নিয়ে নেয়। এর প্রতিবাদে শহরে বিক্ষোভ মিছিল হয়। শুরু হয়ে যায় সামরিক অভিযানের প্র¯‘তি। মেজর জেনারেল ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল খাদিম রাজা ১৮ই  মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চূড়ান্ত করে। ২০ মার্চ জেনারেল হামিদ ও লে: জে: টিক্কা খান প্ল্যানটি অনুমোদন করে।

১৯ মার্চ ১৯৭১ জয়দেবপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে স্থনীয় জনতার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। মানুষ খবর পায়  পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একটি দল জয়দেবপুর ভাওয়াল রাজবাড়ি সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করতে  আসবে। খবর পেয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে হাজার হাজার জনতা বেলা আড়াইটায় জয়দেবপুর রেলগেট এর কাছে গাড়ি ও ভারী  জিনিসপত্র দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। অন্যান্য সড়কের জনতারাও ব্যারিকেড দেয়। জয়দেবপুরের আশপাশের এলাকাতে সেনাবাহিনীর গুলিতে ২০ জন প্রাণ হারায়। সন্ধ্যার পর থেকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত জয়দেবপুরে সান্ধ্য আইন জারি হয়। এ খবর ঢাকায় এসে পৌঁছালে জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। হাজার হাজার মানুষ লাঠিসোঁটা,  বল্লম, বর্ষা নিয়ে রাস্তায় বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে উপস্তিত হয়। বঙ্গবন্ধু সেনাবাহিনীর গুলি  বর্ষণের তীব্র নিন্দা করেন। মূলত ৭ মার্চের ভাষণের পর এটা ছিল বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পালনের প্রথম দৃষ্টান্তও প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ। এদিকে শেখ মুজিব অবিলম্বে সামরিক আইন প্রত্যাহার করে প্রদেশগুলিতে জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব পেশ  করে। এমন অবস্থায় ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে আসে ২১ মার্চ। মুজিবের প্রস্তাব ভুট্টো প্রত্যাখান করে। ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধু  নতুন প্রস্তাব পেশ করেন যা হলো শাসনতান্ত্রিক ভাবে পাকিস্তানকে বিভক্ত করা। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে পালিত হতো। স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐ দিনটিকে প্রতিরোধ  দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। প্রতিরোধ দিবসের কর্মসূচিতে সমগ্র বাংলাদেশে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে স্বাধীন

বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার কর্মসূচি নেয়া হয়। সর্বত্র কুচ্কাওয়াজের মাধ্যমে দিবসটি  পালনের কর্মসূচি নেয়া হয়। বিভিন্ন পত্রিকায় স্বাধীন বাংলার পতাকার অনুপাতসহ মাপ ও নক্সা প্রচারিত হয়। ঢাকায়  কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ পল্টনে কুচকাওয়াজের সাথে পতাকা উত্তোলন কর্মসূচি ঘোষণা করে। জনগণ এই কর্মসূচি  এমন ভাবে সমর্থন করে, ঐ দিন বাংলাদেশের ক্যান্টনমেন্ট এবং গভর্নর হাউজ ছাড়া কোথাও পাকিস্তানের পতাকা  ওড়েনি। সারা বাংলাদেশ লাল সবুজের পতাকায় সজ্জিত ছিল। পল্টন ময়দানে পতাকা উত্তোলনের পর সুসজ্জিত দলের মার্চ পাস্টের অভিবাদন গ্রহণ করেন ছাত্র-সংগ্রাম পরিষদের  নেতৃবৃন্দ। পল্টন ময়দানের অনুষ্ঠান শেষে মার্চপাস্টসহ ছাত্র সংগ্রামের পরিষদের নেতৃবৃন্দ নগর প্রদক্ষিণ করে শেখ  মুজিবের বাস ভবনের অভিমুখে রওনা হন। ৩২ নম্বর পৌঁছালে শেখ মুজিব বাড়ির নিচে নেমে এসে অভিবাদন গ্রহণ  করেন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা আসম আব্দুর রবের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে আন্দোলিত  করতে করতে তিনি বলেন ‘সেই সবচেয়ে ভাল জেনারেল যে কম রক্তপাতে যুদ্ধ জয় করতে পারে।’ শেখ মুজিবের  এই উক্তি, সারাদেশে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন পাকিস্তান রক্ষায় নিয়োজিতদের গাত্রদাহের কারণ হয়।

২৪ মার্চ ১৯৭১ অফিস-আদালত-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে হরতাল পালিত হয়। বাড়িতে বাড়িতে বাংলাদেশের পতাকার  পাশাপাশি কালো পতাকা ওড়ানো হয়। ঐ দিন ঢাকার মিরপুর, চট্টগ্রাম রাজশাহী রংপুর সৈয়দপুরসহ বিভিন্ন স্খানে  সহিংস ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। সৈয়দপুরে সেনাবাহিনীর প্রশ্রয়ে বাঙালিরা  বাঙালিদের ওপর গুলি চালায়। গুলিবর্ষণে অনেক হতাহত হয়। আগের রাত থেকে সকাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনী  সৈয়দপুর সেনানিবাসের পার্শ্ববর্তী বোতালাগাড়ি, গোলাহাট ও কুদ্দুস গ্রাম ঘেরাও করে হত্যাকাণ্ড চালায়। শহরে  কারফিউ দিয়ে সেনাবাহিনী ও অবাঙালিরা মিলে বাঙালিদের ঘর-বাড়িতে আগুন দিয়ে নিরস্ত্রদের গুলি করে হত্যা  করে। রংপুর হাসপাতালের সামনে জনতা ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেনারা রংপুর  সেনানিবাস এলাকায়নিরস্ত্রঅধিবাসীদের উপর বেপরোয়া গুলি চালায়। এতেও অনেক মানুষ হতাহত হয়। ঐ দিন  বিকালে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৭ নম্বর জেটিতে নোঙ্গর করা এমভি সোয়াদ জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস করতে পাকিস্তান  সেনাবাহিনীর একটি দল যায়। খবর পেয়ে হাজার হাজার শ্রমিক-জনতা গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের ঘিরে ফেলে। জনতা  জেটি থেকে কদমতলী পর্যন্ত চার মাইল পথের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড দেয়। সেনারা নিজে অস্ত্র খালাস করে ট্রাকে  তুলে নতুন পাড়া সেনানিবাসে আসার সময় ডবলমুরিং রোডে জনতা দাঁড়িয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে পথ রোধ করে। রাতে সেনাবাহিনী গুলিবর্ষণ করলে বহু শ্রমিক-জনতা নিহত হয়। সন্ধ্যায় মিরপুর সেনাবাহিনীর সাদাপোশাক পরিহিত লোকদের সহযোগিতায় অবাঙালিরা বাঙালিদের ছাদ থেকে স্বাধীন  বাংলার পতাকা ও কালো পতাকা নামিয়ে পুড়িয়ে দেয়। এখানে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করে। কিছু জায়গায়  বাড়ি-ঘরে আগুন দেয়। ঢাকা টেলিভিশন কেন্দ্রে পাহারারত সেনারা টিভি কর্মীদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। এতে কর্মীরা  সন্ধ্যা থেকে ঢাকা টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়।  সন্ধ্যাবেলা প্রেসিডেন্ট ভবনে সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে উ”চপর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের  পক্ষে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ ও ডক্টর কামাল হোসেন উপস্তিত ছিলেন। দুই ঘন্টা ব্যাপী বৈঠক  শেষে তাজউদ্দীন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, আওয়ামী লীগের বক্তব্য শেষ, এখন প্রেসিডেন্টের ঘোষণা দেওয়া  বাকি। ২৪ মার্চ ভুট্টো-ইয়াহিয়া বৈঠকে পাকিস্তানের সংহতি রক্ষায় আর্মি একশনের বিষয় একমত হলেন, অথচ মুখে  বলতে থাকেন আলোচনা চলছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আগত ‘মেহমানগণ’ বিশেষ বিমানে ঢাকা ছাড়েন। মেজর জেনারেল ফরমান ও মেজর জেনারেল খাদিম দুটি হেলিকপ্টারে ঢাকার বাইরে ব্রিগেড কমান্ডারদের নিকট একশনের  জন্য নির্দেশ পাঠাতে থাকেন। সন্ধ্যা সাতটায় রহস্যজনক ভাবে ও প্রচণ্ড গোপনীয়তার সাথে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা  ত্যাগ করেন। এই তথ্য সঙ্গে সঙ্গে উইং কমান্ডার এ কে খন্দকার বঙ্গবন্ধুকে জানিয়ে দেন। মূলত ২৪ তারিখ শেখ  মুজিব তার সিদ্ধান্ত ইয়াহিয়াকে জানিয়ে দেয়ার পরপরই শুরু হয় এই ক্ষণটির জন্য প্রহর গণনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শুরুতেই পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি আত্মগোপন করবেন না। বিশ্বজনমতের সামনে শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত গণতান্ত্রিক  পদ্ধতিতে সমাধান চাওয়ার প্রমাণ এবং বাঙালি আক্রান্ত হওয়ার কারণে স্বাধীনতা ঘোষণা করার যৌক্তিকতা তুলে ধরার  জন্য ছিল এ সিদ্ধান্তছিল যথার্থ। শেখ মুজিবের বিশ্বাস ছিল এতে বিশ্বের শান্তিকামী গণতান্ত্রিক জনতা বাংলাদেশে  ন্যায়-যুদ্ধের পক্ষে দ্রুত সমর্থন দেবে। ফলে নিজেকে শত্রুর হাতে বন্দি হওয়ার জন্য প্র¯‘ত হয়ে ২৫ তারিখ সারাদিন  বিভিন্ন নেতাদের নির্দেশ দিয়ে যেতে থাকেন। শুরু হতে যাওয়া যুদ্ধের অস্ত্র, আশ্রয়, সমর্থন কোথায় পাওয়া যাবে সে  নির্দেশনা যথাযথ নেতৃত্বকে তিনি দিয়ে যান।  এখানে উল্লেখ্য শেখ মুজিব সত্তুরের নির্বাচনে জয় লাভের জন্য যেমন সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলেন তেমনি ২৫ মার্চ  পরবর্তী বিজয় অর্জন সম্পর্কিত সব বিষয়েই প্র¯‘তি নিয়ে রেখেছিলেন। তার অনুপস্তিতিতে আন্দোলন- সংগ্রাম- যুদ্ধ  পরিচালনার বিষয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দায়িত্ব তিনি বিএলএফ নেতৃবৃন্দকে দিয়েছিলেন। তার এ দায়িত্ব  প্রদানের বিষয় আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীন আহমেদসহ সকল নেতাকে জানিয়েছিলেন। এই মহাযজ্ঞে যার দায়িত্ব  যতটুকুতার ততটুকুই জানার কথা। দল আন্দোলন পরিচালনার কর্তৃত্বসহ জনগণকে পরিচালিত করার বিষয়ে  মোটামুটি দিক নির্দেশনা সকলকেই জানিয়ে গিয়েছিলেন। বিগত আন্দোলনের হেড কোয়ার্টার ৩২ নম্বর বাড়িতে  শত্রুপক্ষের আগমণের অপেক্ষায় তিনি ছিলেন। একটি বেতার যন্ত্র তৈরি সম্পন্ন না হওয়ায় ২৫ মার্চ মধ্যরাতে স্বাধীনতা ঘোষনার জন্য ই পি আই— এর অয়্যারেলসের সাহায্যে। যখন পাক বাহিনীর নিরস্ত্র জনতার প্রথম গুলির শব্দ হল,  তখন পাকিস্তান রেডিওর ওয়েভ লেšে’র পাশে শেখ মুজিবের ক্ষীণ কণ্ঠ ভেসে এল… মনে হল এটি পূর্বে রেকর্ডকৃত। শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রূপে ঘোষণা করেন। ঘোষণায় বঙ্গবন্ধু বলেন :

পাকিস্তান সেনাবাহিনী অতর্কিত পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আক্রমণ করেছে। শহরে লোকদের হত্যা  করছে। ঢাকা চট্রগ্রামের রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন করছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা  বীরত্বের সঙ্গে মাতৃভূমি মুক্ত করার জন্য শত্রুদের সাথে যুদ্ধ করছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আপনাদের কাছে আমাদের  আবেদন ও আদেশ দেশকে স্বাধীন করার জন্য শেষ রক্ত বিন্দু থাকা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যান। আপনাদের পাশে এসে যুদ্ধ করার  জন্য পুলিশ, ইপিআর, বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও আনসারদের সাহায্য চান। কোন আপোষ নাই, জয় আমাদের হবেই। আমাদের  পবিত্র মাতৃভূমি থেকে শেষ শত্রুকে বিতাড়িত করুন। সকল আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও অন্যান্য দেশপ্রেমিক ও স্বাধীনতা  প্রিয় লোকদের এ সংবাদ পৌঁছে দিন। আল্লাহ আপনাদের মঙ্গল করুন। জয় বাংলা।

লে: কর্নেল জেড এ খান ও কোম্পানি কমান্ডার মেজর বেলাল পঞ্চাশজন কমান্ডো সৈন্য নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে প্রবেশ  করে, গোলাগুলির ভেতরে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে এসে বললেন ‘থামাও গুলি। কি চাও তোমরা?’ তাঁকে গ্রেফতার করে সেকেন্ড  ক্যাপিটাল (শেরেবাংলা নগর) নিয়ে যাওয়া হয়। পর দিন তাঁকে ফ্লাগ স্টাফ হাউজে রাখা হয় এবং তিনদিন পর ঐখান  থেকে সরাসরি করাচী পাঠিয়ে দেয়া হয়। ২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশ দখলের জন্য আধুনিক  সমরাস্ত্র নিয়ে যে পৈশাচিক বর্বর তাণ্ডব শুরু করেছিল, বাংলাদেশের মানুষের স্বশস্ত্র বিপ্লব ছাড়া আর বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না। ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম গণহত্যা রাত ২৫ মার্চ ১৯৭১ এর মধ্য রাত। বাঙালীদের জীবনে আর কখনো এমন রাত  আসেনি। এক সঙ্গে দেশের আপামর জনগণকে এত তীব্র যন্ত্রণা, নৃশংসতা ও পৈশাচিক রাত আর দেখতে হয়নি।  এ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশ দখলের জন্য ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামে ‘আধুনিক সমরাস্ত্র’ দিয়ে ব্যাপক  নিধনযজ্ঞের প্রস্তুতি নিয়ে যে পৈশাচিক বর্বর তাণ্ডব শুরু করেছিল সারা বাংলাদেশব্যাপী বড় বড় শহরে। বিভিন্নস্থানে  বাঙালিরা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ছাত্র-জনতার প্রথম প্রতিরোধের মুখে পড়ে ফার্মগেটের  কাছে। সেনাবাহিনী লাউডস্পিকারে গোটা ঢাকায় সান্ধ্য আইন জারির ঘোষণা দিয়ে সন্ধ্যা থেকে ছাত্র-জনতার দেয়া  রাস্তার ব্যারিকেড সরিয়ে সরিয়ে শহরের দিকে আগাতে থাকে। সাঁজোয়া যানের আওয়াজ, গুলির শব্দ, গোলার  বিস্ফোরণ আর মানুষের আর্তচিৎকারে ঢাকা নগরী বিভীষিকাময় শহরে পরিণত হয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা  ছাড়া আর বিকল্প কোনো পথ খোলা থাকে না।২৫ মার্চ, ইয়াহিয়ার গণহত্যার চিত্র প্রকাাশিত হয় ডেইলি টেলিগ্রাফের সাংবাদিকের সায়মন জন ড্রিংক এর প্রতিবেদন  ঞধহশ ঈৎঁংয জবাড়ষঃ রহ চধশরংঃধহ এ। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল প্রভাবশালী দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট ঐড়ি উধপপধ চধরফ ভড়ৎ ধ টহরঃবফ চধশরংঃধহ. ১৯৭১ সালে সায়মন জন ড্রিং ছিলেন কম্বোডিয়াতে সংবাদ  সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। দেশটিতে তখন সরকারি বাহিনীর সাথে খেমাররুজদের যুদ্ধ চলছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে টেলিগ্রাফের সম্পাদক তাঁকে লন্ডন থেকে ফোন করে ঢাকার পরিস্তিতি বর্ণনা করে। তিনি ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নেন।  তিনি মার্চের প্রথম সপ্তাহে এসে ঢাকায় পৌঁছান। ২৫ মার্চ বিকেলে সায়মনসহ ২০০ বিদেশি সাংবাদিক ঢাকার হোটেল  ইন্টারকন্টিনেন্টালে অবস্থান করছিল। তাদের মধ্যে গুঞ্জন ছিল— আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ইয়াহিয়া সামরিক অভিযানের  নির্দেশ দিয়েছেন। সায়মন বুঝতে পেরেছিলেন ঈযরঢ়ং ধৎব ফড়হি (খুব খারাপ কিছু ঘটতে যা”েছ) আজ রাতেই  ২৫ মার্চ ১৯৭১।  সায়মন উল্লেখ করেন, ‘সন্ধ্যা থেকে হোটেলের পাশে সৈন্যদের দেখা যায়। পরিবেশটা এমন যে কোন সময় যেকোনো  কিছু ঘটতে পারে। হোটেল থেকে কাউকে বের হতে দেয়া হচ্ছিল না। হোটেলে প্রচুর পুলিশ ও সেনা। ভেসে ভেসে  গুলির শব্দ, তখন তারা নিশ্চিত হন সেনারা মুভ করছে। এরপর আনুমানিক ১১ টার দিকে চারিদিকে প্রচণ্ড গুলির  শব্দ। শেলিং, শব্দ আসছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এর কিছুপরেই যুদ্ধাস্ত্রের গর্জন। এই শব্দ রাজারবাগ এলাকার। ঢাকার সড়কগুলো ফাঁকা। চারিদিকে গুলির শব্দ। ঐ কালরাতে হোটেলের ছাদ থেকে সায়মনরা ছবি তুলছিলেন। ভিডিওগ্রাফাররা শুটিং করছিল। সেদিন সন্ধ্যায় তিনি শেখ মুজিবের বাসায় ফোন করেন। জানার চেষ্টা করেন বঙ্গবন্ধুর  সিদ্ধান্ত। বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি বাদশার সাথে তার কথা হয়। তিনি জানান বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত তিনি বাসাতেই  থাকবেন। মধ্যে রাতে আবার বঙ্গবন্ধুর বাসায় ফোন করে টেলিফোন বিকল (ডেড) পান।’

২৫ মার্চের ক্রাকডাউনের পর বিদেশি সাংবাদিকদের ঢাকা থেকে বহিস্কার করা হয়। মেজর সিদ্দিক সালিক এতে  ভূমিকা রাখেন। তিনি ছিলে গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার এবং সামরিক সরকারের প্রেস লিয়াজোঁ অফিসার। তিনি  হোটেলে এসে কড়া কড়া কথা শোনান। তখন তিনি মেজর সিদ্দিক সালিকের কাছে জিজ্ঞেস করেন ‘মেজর কি হচ্ছে?  আমাদের চলে যেতে হবে? তখন চতুর সিদ্দিক বলেন, ‘এটা একটা গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি। এখানে থাকাটা খুবই ভয়ংকর।  আমরা তোমাদের নিরাপত্তার কথা ভাবছি। এখানে থাকাটা তোমাদের নিরাপদ নয়। তার কথা শুনে তিনি কৌশলে  হোটেল ছাদে এয়ারকন্ডিশনার রুমের পেছনে লুকিয়ে থাকেন। পাকিস্তানিরা একটা ভুল করেছিল, মিলিটারি ট্রাকে  যখন সাংবাদিকদের তুলে নেন গননা করে তোলেননি। এর পর সতর্কতার সাথে তিনি হোটেল লবিতে নেমে আসেন।  লবি ম্যানেজার তাঁকে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তখন তিনি জানতে পারেন, ফ্রেঞ্চ এপির ফটোগ্রাফার মিশেল  লরেন্ট রয়ে গেছেন। তিনি আনন্দিত হন। একজন ফটোগ্রাফার ও একজন রিপোর্টার মিলে কাজ করা যাবে। ২৭ মার্চ তিনি ও মিশেল বিদেশি পোশাক ছেড়ে সাদা পাঞ্জাবি পরে রাজারবাগ, ধানমন্ডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ঘুরে পুরাতন ঢাকায় যান। বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে হেঁটে জগন্নাথ হলে ঢুকে হলের দোতালায় তিনি কিছু মরদেহ দেখতে  পান। মরদেহের প্রতি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষিত হয়।’ সে উপুড় হযে পড়েছিল, শরীরের নিচ দিয়ে শুকনো রক্তের ধারা,  মনে হচ্ছিল একটি পেইন্টিং। ‘এর পর তিনি সেখান থেকে ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে গিয়ে বুঝতে পারেন, সেখান  থেকে জগন্নাথ হলে শেলিং করা হয়েছে। সেখানে একটি কোয়ার্টারে এক শিক্ষক দম্পতিকে হত্যা করা হয়। সব দেখে  তাঁর মনে হয়েছিল ঠাণ্ডা মাথায় এক ভয়ঙ্কর গণহত্যা।  সেখান থেকে তিনি যখন ইকবাল হল বর্তমান জহুরুল হক হলে যাচ্ছিলেন, তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি টহল  দল ঐ এলাকা অতিক্রম করছিল। তারা দূর থেকে তাঁদের দেখে ফেলে। কিন্তু তারা গাড়ি থামায়নি। বিকালে হোটেলে  ফিরে জানতে পারেন সেনাবাহিনী হোটেলে গিয়ে তাঁদের খোঁজে পুরো হোটেলে তল্লাশি চালায়। বাধ্য হয়ে তাঁদের  ঢাকা ছাড়তে হয়। তাদের তোলা ছবিগুলো তারা নিয়ে যেতে পারেনি । ভারতের আকাশসীমায় নিষেধাজ্ঞা থাকায়  তখন প্লেন চলাচল করত ঢাকা-কলম্ব-করাচি রুটে। সায়মন ঢাকা থেকে সিলন্ (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) পৌঁছান। সেখানে  এক ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। সেখানে পৌঁছে তিনি কলম্বো ব্রিটিশ হাইকমিশনে ফোন করে রাজনৈতিক আশ্রয় চান।  তারা জানিয়ে দেন কোনো ভাবেই সম্ভব নয়। বাধ্য হয়ে সায়মন উঠে পড়ে করাচিগামী প্লেনে। করাচীতে পৌঁছালে  তারা সাংবাদিক মনে করে লাগেজ চেক করে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে, পায়ুপথে চেক করে। তবে সায়মন মোজা খুলে  কৌশলে, যাতে ফিল্মগুলো মোজার ভিতরে থাকে। সায়মন ফিল্মগুলো লুকাতে পারলেও মিশেল ক্যামেরা লুকাতে  পারেনি। সায়মনের ধারণা সিদ্দিক সালিক তাদের ব্যাপারে জানতে পারে, তাই সে করাচিতে ম্যাসেজ পাঠায়। যার  জন্য এই তল্লাশি। ছাড়া পেয়ে তারা ব্যাংক এর উদ্দেশ্য প্লেনে উঠে, জুতোর ভিতর থেকে নোট গুলো বের করে,  প্লেনে বসে স্টোরি তৈরি করেন। বিমান থেকে নেমেই তিনি চলে যান ব্যাংকক টেলিগ্রাফের ব্যুরো অফিসে। সেখানে  বসে স্টোরি ফাইনাল করেন। ৩০ মার্চ টেলিগ্রাফে প্রকাশ হয় তাঁর বিস্তারিত প্রতিবেদন। যা ছিল বাংলাদেশের  গণহত্যার বিশ্ব গণমাধ্যমে প্রথম প্রকাাশিত প্রতিবেদন। এরপর দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রাক্কালে কলকাতা থেকে ভারতীয়  সেনাবাহিনীর ট্যাংক করে তিনি ঢাকায় আসেন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট দেখা করেন সিদ্দিক সালিকের সাথে। ঐ সময়  এক প্রশ্নের জবাবে সিদ্দিক সালিক বলে, ’তোমাকে খুঁজে পাওয়া গেলে, নিশ্চিত হত্যা করা হতো।’ প্রকৃতি আমাদের  সহায় ছিল বলেই হযতো পাকিস্তান জান্তা ভুল করে সায়মন জন ড্রিংকে সনাক্ত করতে। বিশ্ববাসী জানতে পারে, পূর্ব  পাকিস্তানের গণহত্যার কাহিনি এবং বুঝতে পারে আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে, স্বাধীনতা ছাড়া আমাদের  বিকল্প কোনো পথ নেই।

‘স্বাধীনতা- হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কে বাঁচিতে চায়? দাসত্ব -শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে, কে পরিবে পায়। কোটিকল্প দাস থাকা নরকের প্রায় হে, নরকের প্রায়!’ স্বাধীনতা সঙ্গীত —রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায় । গ্রš’ ঋণ: আবু সাইয়িদ (১৯৯৪), বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড ফ্যাক্টস্ এন্ড ডকুমেন্টস্, জ্ঞানকোষ, ঢাকা। এ বি এম এ খালেক মজুমদার (১৯৮৫), শিকল পরা দিনগুলো, সাজ্জাদ খালেক মুরাদ প্রকাশিত, ঢাকা। ড. কামাল হোসেন (২০২৩), মুক্তিযুদ্ধ কেন অনিবার্য ছিল, প্রথমা, ঢাকা। মনিরুল ইসলাম (২০১৩), জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও সমাজতন্ত্র, বাতিঘর, ঢাকা। রাহাত মিনহাজ (১৯২৪), ১৯৭১: তাজউদ্দীন, মুজিব বাহিনী ও অন্যান্য, শ্রাবণ, ঢাকা ।শ্রীনাথ রাঘবন (২০২৪), ১৯৭১: বাংলাদেশ সৃষ্টির বৈশ্বিক ইতিহাস, প্রথমা, ঢাকা ।সিরু বাঙালি (২০১৯), বাঙাল কেন যুদ্ধে গেল, আদিগন্ত প্রকাশন, ঢাকা ।ড. হারুন অর-রশিদ (২০১৬), “আমাদের বাঁচার দাবী” ছয় দফা’র পঞ্চাশ বছর, বাংলা একাডেমি, ঢাকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *