ওয়াহিদ জামান
রস্তুমের সাথে ফজিলার বিবাহ হয়েছে প্রায় তিন বছর। এই অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। ফজিলার অতীত নিয়ে প্রায়ই রুস্তম খোটা দেয়। বিবাহের আগে ফজিলার ফজরের সাথে সম্পর্ক ছিল। রস্তুম যেভাবে ফজিলাকে কথার বাণে জর্জরিত করে, আসলে ফজিলার সাথে ফজরের তেমন সম্পর্ক ছিল না। তাদের সম্পর্ক ছিল পবিত্র। তবে এটা সত্য ফজিলা ফজরকে প্রকত অর্থে ভালোবাসত। ফজর ফজিলার সম্পর্কে ফুফাতো ভাই। অতি শৈশবে তাদের একসাথে বেড়ে ওঠা। প্রথমদিকে তাদের সম্পর্ক ছিল নিছক খেলার সাথী। কিন্তু যৌবনে পদার্পনের পর তারা একে অপরকে বুঝতে শুরু করে। অবশ্য ফজিলা ফজরের এরকম আহবানে সাড়া দিতে চায়নি। কিš‘ ফজর নাছোড়বান্দা। একসময় ফজিলা তার প্রতি দূর্বল হয়ে পড়ে। এলাকায় সকলে তাদেরকে বিশেষ নামে ডাকত। তারা লাইলি-মজনু নামে সমাদৃত হতে লাগলো। একসময় ফজিলা ফজরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ফজিলা ফজরকে বলত, আমার ক্যান জানি মনে হয়, তুমারে আমি পামু না। উত্তরে ফজর বলত, কি সব অলক্ষুণে চিন্তা করো তুমি। – আমার এইসব চিন্তা মাথায় আসে। – ক্যান আসে – ক্যামনে কমু – দেখ, এসব বাজে চিন্তা মাথায় আনবা না। আমি কোন দিন তোমারে ফাঁকি দিমু না। ফজরের কথা ইদানীং ফজিলার খুব মনে পড়ে। সে ফজরকে ভুলে থাকতে চায়। সে মনে করে রস্তুমই তার বর্তমান, তার ভবিষ্যৎ। কিন্তু রস্তুমের নোংরা আচরণে ফজিলার অতীত তার মনের খিড়কির দরজায় বার বার কড়া নাড়ে।
দুই
রস্তুমের পরিবারের সদস্যরাও ফজিলার জীবন বিষিয়ে তুলেছে। পান থেকে চুন খসলে ফজিলার সাথে তারা ঝগড়া বাধিয়ে দেয়। ফজিলার শ্বাশুড়ি ইদানীং উঠতে বসতে খোটা দিয়ে কথা বলে। সেদিন তরকারিতে লবন বেশি হওয়ায় বেশ কিছু কথা শুনিয়ে দেয় ফজিলাকে। আগে সে নীরবে সব সহ্য করত কিন্তু আজকাল কিছুটা প্রতিবাদী। শ্বাশুড়ি তাকে খোটা দিয়ে বলে, তরকারিতে লবন বেশি ক্যান? মন কনে থাকে। কাজকামে তো মন নেই। উত্তরে ফজিলা বলে, আপনি সবসময় এসব কন ক্যান। – ক্যান কই বুঝোনা। তোমার মন থাহে কনে – কনে থাকবো, আমার কাছে থাহে ফজিলার এরকম সরাসরি উত্তর শুনে তার শ্বাশুড়ি তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে। চেচিয়ে বলে, ওরে হারামজাদি। মুখে মুখে তক্ক করিস। আজ রস্তুম বাড়িতে আসুক। ফজিলা কথা না বাড়িয়ে ঘরে চলে যায়। তখনো শ্বাশুড়ি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। রস্তুম বাড়িতে আসার পরে তুলকালাম কান্ড বাধিয়ে দেয়। ফজিলাকে নানাভাবে শাসায়। বলে, আমার সাথে সংসার করতে হলে আমার মতো করে চলতে হইব। ফজিলা কিছু বলে না। রস্তুম বলতেই থাকে। একপর্যায়ে ফজিলার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সে আর সহ্য করতে পারে না। তখন সে বলে, তোমার যদি আমাকে অসহ্য লাগে আমারে তালাক দাও। একথা শুনে রস্তুম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ফজিলার শ্বাশুড়িও রস্তুমের সাথে সূর মেলায়। বলে, আমার পোলা তোরে তালাক দিব ক্যান। তোর ভালো না লাগলে তুই দূর হ। ফজিলা উত্তেজিত হয়ে বলে, তাই হব। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রস্তুম বেপরোয়া হয়ে যায়। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে যেয়ে ফজিলার চুলের মুষ্টি ধরে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকে। ফজিলার শ্বাশুড়ি নীরব দর্শকের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। এদিকে ফজিলার নাকমুখ রস্তুমের এলোপাতাড়ি ঘুষিতে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। তারপরও পাষন্ড রস্তুমের রাগ প্রশমিত হয় না। সে ফজিলার কন্ঠনালী চেপে ধরে। ফজিলা কিছু একটা বলতে চায় কিন্তু অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ ছাড়া কিছুই বোঝা যায় না। তারপর একসময় ফজিলা জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। অজ্ঞান নিথর ফজিলা ঘরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে।
তিন
ঐ দিনের পর হতে রস্তুম ফজিলার সাথে ঘুমায় না। জেদি ফজিলাও রস্তুমের সাথে কোন ধরনের কথা বলে না। তার বিশ্বাস সে নিরপরাধী। ফজরের সাথে তার সম্পর্ক ছিল পবিত্র। আর তা ছিল বিবাহের আগে। কেন এসব বিষয়ে তাকে বারবার কথা শুনতে হবে। তবে ফজিলা সবকিছু ভুলে সংসার টিকিয়ে রাখতে চায়। সে জানে আমাদের
সমাজ ব্যবস্তায় ছেলেদের কোন দোষ ত্রুটি নেই। সব দোষ মেয়েদের। ফজিলা জানতে পেরেছে ইদানীং রস্তুম রানু নামে এক মেয়ের সাথে সময় কাটায়। গ্রামের অনেকেই তাকে এসব ব্যাপারে বলেছে। কিন্তু সে এবিষয়ে রস্তুমকে কিছু বলেনি। সে কৌশলে তাকে ঘরমুখো করার চেষ্টা করছে কিন্তু কোন ফল হচ্ছে না। রস্তুম কথা বলে না কিš‘ জৈবিক চাহিদা মেটাতে ঠিকই রাতের আধারে ফজিলার কাছে আসে। ফজিলা রস্তুমে জৈবিক আহবানে সাড়া দিতে চায়নি। কিন্তু যখন ভাবলো, যত খারাপই হোক তার সাথেই তাকে জীবন কাটাতে হবে তবে অভিমান বা রাগ করে লাভ কী। তাই পরম আদরে রস্তুমকে সোহাগ করে। তার বিশ্বাস সে রস্তুমকে রানুর কাছ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। একদিন রস্তুমকে বলে, মাথাটা ঠান্ডা রাখা যায় না – ক্যান, আমার মাথা ঠান্ডা না – তা আমি কচ্ছি না – খুলে কও। – কচ্ছিলাম প্রত্যেক মানুষের কিছু অতীত থাকে। আমারও তেমন কিছু হয়তোছিল। কিন্তু তুমি বিশ্বাস করো, তুমি যেটা মনে করো আমি তেমন কিছুই করিনি। রস্তুম চুপচাপ শোনে। কোন কথা বলে না। নিজের জৈবিক চাহিদা মিটিয়ে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে।
চার
রানুর সাথে রস্তুমের মাখামাখি এলাকায় রাষ্ট্র হয়ে যায়। সবার মুখে মুখে রানু আর রস্তুমের প্রেমের গল্প। এজন্য লজ্জায় ফজিলা বাহিরে বের হতে পারে না। গ্রামের বাজারে রস্তুমের বড় মুদি দোকান। আগে মাঝে মধ্যে ফজিলা বাজারে রস্তুমের দোকানে যেত। কিন্তু রানুর সাথে তার এই সম্পর্কের কাহিনি যেদিন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে সেদিন থেকে ফজিলা আর দোকান মুখো হয়নি। তবে ফজিলা বাস্তববাদী। সাধারণ মানুষের কানকথা সে বিশ্বাস করতে চায় না। নিজের চোখে না দেখা পর্যন্ত সে বিষয়টা আমলে নিতে চায় না। একদিন ফজিলা দোকানে যায়। কিন্তু দোকান বন্ধ দেখে তার মধ্যে সন্দেহ আরও বেশি করে দানাবাঁধে। পাশের দোকানের দিলীপ দাদার কাছে রস্তুমের খবর জিজ্ঞেস করে। কিন্তু দিলীপ স্পষ্ট কিছু বলতে পারে না। আমতা আমতা করে। তখন ফজিলার বিষয়টি উদঘাটনের আগ্রহ বেড়ে যায়। বিশেষভাবে জিজ্ঞেস করে, দাদা সত্যি করে কনতো রস্তুম কনে? দিলীপ বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফজিলা এমনভাবে দিলীপকে অনুরোধ করে দিলীপ পড়পড় করে বলতে শুরু করে। বলে, বউদি আমি যে ঘটনাটা জানি আপনি কোনদিন রস্তুম ভাইকে কইয়েন না ফজিলা অভয় দেয়। তখন দিলীপ বলতে শুরু করে। বলে, প্রায়ই রস্তুম ভাই দোকান বন্ধ রাইখা জব্বার সানার মাইয়া রানুর কাছে যায়। – তাই নাকি – হ বউদি। এরাম করতি থাকলে ব্যবসা লাটে উঠবো। ফজিলার মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু বলতে পারে না। চুপচাপ দিলীপের কথা শুনে। দিলীপ বলেই চলে, আপনার সাথে রস্তুম ভাইয়ের বিবাহের আগে রানুর সাথে সম্পর্ক ছিল। অনেকে কয় রস্তুম ভাই নাকি রানুরে বিয়া করছে। ফজিলা নির্বাক হয়ে যায়। একমুহূর্তের জন্য আর অপেক্ষা করে না। বাড়ি চলে আসে। বিমর্ষ ফজিলা কোন কাজে মন বসাতে পারে না। দিলীপ দাদার কথা সারাক্ষণ তার কানে বাজে। রাতে রস্তুম বাড়িতে ফিরলে ফজিলা রানুর সাথে তার কিসের সম্পর্ক জানতে চায়। ফজিলার মুখে রানুর নাম শুনে রস্তুম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে। ফজিলার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। সেও রস্তুমের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে। রস্তুম আর ফজিলার মাঝে তার শ্বাশুড়ি ঢুকে পড়ে। ফজিলাকে নানাভাবে তিরস্কার করে। তখন ফজিলা আর সহ্য করতে পারে না। শ্বাশুড়ির কথার জবাবে বলে, আমারে কন ক্যান। আপনার পোলারে কইতে পারেন না। – পোলারে কী কমু। – আপনার পোলা যে অন্য মাইয়ার লগে থাহে সেইডা কইতে পারেন না। ফজিলার শ্বাশুড়ি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। চিৎকার করে বলে, মুখ সামলে কথা কইস মাগী। পুরুষ মানুষ এরকম একটু করবোই। তোর দোষ। তুই আমার পোলারে ঘরে রাখতে পারোস না ক্যান। – আপনার পোলারে জিগান ক্যান ঘরে থাকে না ফজিলার একথা শুনে রস্তুম উন্মাদ হয়ে যায়। বিদ্যুৎ বেগে ছুটে যেয়ে ফজিলার চুলের মুষ্টি ধরে। স্বজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। ছেলে -মা মিলে পাদিয়ে পিষিয়ে ফেলে। অসহ্য যন্ত্রণায় ফজিলা ছটফট করে।
পাঁচ
ফজিলা রস্তুমের সংসার ছেড়ে চলে আসে। ফজিলার বাবা মা তার চলে আসার কারণ জানতে চায় কিন্তু এ ব্যাপারে ফজিলা কিছু বলতে চায় না। ফজিলার রহস্যময় আচরণে ফজিলার বাবা রহমত মোল্লা ভীষণ চিন্তায় পড়ে যায়। তিনি ফজিলার মায়ের সাথে পরামর্শ করেন। সিদ্ধান্ত নেন রস্তুমের সাথে দেখা করার। পরের দিন রহমত মোল্লা মেয়ের শ্বশুর বাড়ি চলে আসে। কিন্তু তিনি তাদের আচরণে ভীষণ ক্ষুব্ধ হন। রস্তুমের মা, রস্তুম নিজে কেউই রহমত মোল্লার সাথে শোভনীয় আচরণ করেনি। তখন তিনি বুঝতে পারেন ফজিলার কোন দোষ নেই। বিদায়ের সময় রস্তুমকে একান্তে ডেকে কথা বলেন রহমত মোল্লা। বলেন, বাবারে তোমাগোর স্বামী স্ত্রীর মধ্যে কি হইছে জানবার চাই না। শুধু মুরুব্বি হিসেবে কইতে চাই সংসার জীবনে এরকম একটু আধটু বিবাদ হতেই পারে। তাই বলে দুজন দুজায়গায় থাকবা, ইডা কেমুন কথা। শ্বশুরের কথা শুনে রস্তুম কোন সম্মান না করে মুখের ওপর বলে, আপনার মাইয়ার আর আমাগোর এখানে আসার দরকার নেই। রস্তুমের কথা শুনে রহমত মোল্লার মাথা ঘুরে যায়। বুঝতে পারে না কি করা উচিৎ। নিজেকে সংযত রেখে বলে, এসব কি কইতাছো বাজান। – ঠিকই কইতাছি – না বাজান এতো বড়ো জুলুম কইরো না। ফজিলার যদি কোন ভুল ত্রুটি থাকে আমারে কইতে পারো। আমি সংশোধন করুম তারে। এবার রস্তুম বিব্রত হয়। রাখঢাক না রেখে সরাসরি বলে, দ্যাখেন এত প্যাচাল পাড়ার টাইম নাই। আমি ওরে নিয়া সংসার করুম না। এডাই শেষ কথা। একথা বলে রস্তুম হনহন করে চলে যায়। রহমত মোল্লা নির্বাকের মতো দাঁড়িয়ে থাকে। হঠাৎ তার শরীরটা কেমন যেন করতে থাকে। আস্তেধীরে হেটে একটা গাছের নিচে এসে বসে। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাড়ির দিকে রওনা হয়।
ছয়
ফজিলা তার বাবার ওপর অনেক রাগ করে। তাকে না জানিয়ে কেন তিনি রস্তুমের সাথে দেখা করেছেন। ফজিলার মা আলেয়া বিবি বলেন, রাগ করিস ক্যানরে মা। বোয়েস্তা বিবাহিত মেয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে বাবার বাড়ি থাকলে কোন বাবা-মা সুখে থাকে না। – আমি সব বুঝি মা। এতো কিছুর পরও ঐ শয়তানের ঘর করবার কও আমারে? আলেমন বিবি কি বলবে বুঝতে পারে না। ফজিলার কথার কোন জবাব না দিয়ে পাশের ঘরে চলে যায়। ফজিলা মনে পণ করে সে আর রস্তুমের সাথে কোন ধরনের যোগাযোগ করবে না। বাবার এতবড় অপমান তার মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘদিন রস্তুমের সাথে ফজিলার কোন যোগাযোগ নেই। ফজিলা নিজে কিছু করবার চিন্তা করে। এদিকে ফজিলার বাবার শরীরও ক্রমশ অবনতির দিকে যায়।
বাবার সংসারে নিজেকে তার বোঝা মনে হয়। চারিদিকে কাজের জন্য খোঁজখবর নেয়। কিন্তু মোফাশ্বল এলাকায় কাজ পাওয়া খুব কঠিন। ফজিলা তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। ফজিলার এই অলস জীবনে আবার ফজরের আগমন ঘটে। ফজরের সাথে সম্পর্কের কারণে ফজিলার যে তিক্ত অভিজ্ঞতা শ্বশুর বাড়িতে অর্জন করেছে তার আর পুনরাবৃত্তি ঘটুক ফজিলা তা চায় না। কিন্তু ফজর ফজিলাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ফজিলা তা প্রত্যাখান করে। একদিন পুকুর ঘাটে ফজরের সাথে দেখা। ফজিলা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ফজর সরাসরি সামনে এসে দাঁড়ায়। বলে, আমারে এড়িয়ে চলছিস ক্যান ফজিলা। – জানিনা -তোর তো আমি কোন ক্ষতি করিনি – আমি কি কইছি তুমি আমারে ক্ষতি করছ? – তাহলে আমারে দেখলে অন্য পথ দিয়ে যাস ক্যান – এতো কথা কওনের সময় মাই। পথ ছাড়ো আমি যামু। ফজর সরে দাঁড়ায়। ফজিলা বিদ্যুৎ বেগে চলে যায়।
সাত
রস্তুম রানুকে বিয়ে করে ঘরে আনে। এ সংবাদ ফজিলার কাছে আসে। দীর্ঘদিনের ব্যবধানে এটা ফজিলার ওপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। তবে মাঝে মধ্যে ফজিলা কিছুটা বিচলিত হয়। ধীরে ধীরে সে ফজরের প্রতি আবার ঝুঁকতে শুরু করে। ফজরের সাথে তার বিবাহপূর্ব সম্পর্ক ছিল পবিত্র। কিন্তু‘ এখন ফজরের মধ্যে ফজিলার জন্য যে টান সেটা প্রেম ভালোবাসা নয় – মোহ। ফজিলা তা বুঝতে পারে না। ফজর ফজিলার সাথে প্রায় দেখা করে। কথা বলে। অপাঙ্কতেও ফজিলা ফজরের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। তবে মাঝে মাঝে তার নিজের প্রতি ধিক্কার হয়। যখন তার মনে হয় ফজর বিবাহিত, তার মত একজন স্ত্রী আছে, একটা ফুটফুটে মেয়ে আছে তখন সে নিজেকে গুটিয়ে রাখে। কিন্তু ফজর নাছোড়বান্দা। সে সুকৌশলে ফজিলাকে তার প্রতি আকর্ষিত করে। ফজরের সাথে ফজিলার দৈহিক সম্পর্ক হয়। যেটা ফজিলা কোন দিন চায়নি। এটার জন্য ফজরই দায়ী। একদিন চাঁদনি রাতে ফজর ফজিলার সাথে দেখা করতে আসে। ফজিলাদের বাড়ির অদূরে সুপারি বাগানের ধারে ফজর অপেক্ষা করে ফজিলার জন্য। ফজিলা এসে বলে, এত যায়গা থাকতে এখানে আসতে কইছো ক্যান। – দিনের বেলা তোর লগে কথা কওয়াতো মুশকিল। দেখিস না গ্রামের মানসে ক্যামনে ড্যাবডাবাইয়া চাইয়া থাকে। – হ তা ঠিক। কি কইবা জলদি কইরা কও। রাতে এভাবে তোমার লগে দেখা করা ভালো হইতাছে না – কি যে কস তুই। ভালো হইবে না ক্যান। তোরে আমি ভালোবাসি না? – হইছে। আর ত্যাল মারতে হইব না ফজর ফজিলার একথা শুনে অভিমান করে। ফজিলা তা বুঝতে পারে। ফজরকে স্বাভাবিক করার জন্য ফজিলা বলে, তুমি রাগ করছ। তোমারে আঘাত করার জন্য কই নাই। ফজর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। কৌশলে ফজিলাকে দূর্বল করার জন্য ফন্দি আঁটতে থাকে। ফজরের অভিমান ভাঙ্গানোর জন্য ফজিলা বলে, আচ্ছা বুঝলাম তো কথাটা আমার কওয়া ঠিক হয় নাই। এহন কও কি করলে তোমার রাগ ভাঙ্গবো। ফজর জমিলার এই দূর্বল মূহুর্ত কাজে লাগায়। ফজিলাকে জড়িয়ে ধরে আবেগে কাঁদতে থাকে। ফজিলা ভুলেই যায় ফজর তাকে জড়িয়ে আছে। সে তার আবেগে নিজেও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অনেক দিন পরে পরপুরুষে স্পর্শ তাকে উত্তেজিত করে তোলে। কিš‘ নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে। এদিকে ফজর হঠাৎ ফজিলার গ্রীবা, ঠোঁট নানা স্পর্শকাতর যায়গায় চুম্বন করে। ফজিলা বাধা দেয়। বলে, এসব কি করো তুমি। ছাড় আমি যামু। কিন্তু ফজর বেপরোয়া হয়ে যায়। ফজিলার কথায় কর্ণপাত করে না। আদরে সোহাগে ফজিলাকে উত্তেজিত করে তোলে। বহুকাল পরে পুরুষের আলিঙ্গন ও স্পর্শ একসময় ফজিলাকে দিকশূন্য করে তোলে। সেও আর ফজরকে বাধা দেয় না। তারা একে অপরকে নতুনভাবে অনুভব করে।
আট
ফজর ফজিলার সাথে নিয়মিত জৈবিক চাহিদা মেটায়। ফজিলা প্রথম প্রথম আপত্তি করলেও একসময় সেও বিষয়টা স্বাভাবিক মনে করে। ফজর তাকে অভয় দেয় যে সময়-সুযোগে সে ফজিলাকে বিয়ে করে ঘরে তুলবে। কিš‘ তা সে করে না। একসময় ফজিলা নিজেকে অন্তশ্বত্ত্বা অবস্থায় আবিষ্কার করে। ফজিলা ভীষণ উদবিঘ্ন হয়ে পড়ে। কুলকিনারা পায় না। বিষয়টা ফজরকে অবহিত করে ফজিলা। ফজর অস্বীকার করে না। কিন্তু কালক্ষেপণ করে। আর মতলব আঁটতে থাকে কিভাবে ঝামেলা চুকানো যায়। একদিন সে ফজিলাকে বলে, তোরে তো আমি বিয়া করুম। কিন্তু তোর গর্ভের সন্তান নষ্ট করতে হইব। ফজরের কথা শুনে ফজিলা বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। বলে, এসব কি কও তুমি। – বুঝিস না ক্যান। বিয়ার আগে সন্তান আসা আমাগো সমাজে কেমন দেখায় না – সন্তান আইছে অল্প কয়েকদিন হলো। তুমি আমারে বিয়া করলে সব ঝামেলা শ্যাষ হইব। ফজিলার উত্তর শুনে ফজর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। বলে, তোর কথা ভাবলে হইব। আমাকে সমাজে চলতে হইব না? সাথে সাথে প্রতিবাদের সুরে ফজিলা বলে, ও আ”ছা। তোমার সমাজ আছে আর আমি সমাজের বাইরের মানুষ। – তর্ক করিস না। তোর আমার দুজনেরই মানইজ্জতের ব্যাপার। তাই কইতেছিলাম, রাগ না করে বিষয়টার সমাধান করি। কিন্তু ফজিলা জিদ ধরে। তার একটাই কথা সে সন্তান নষ্ট করবে না। চতুর ফজরফজিলার অপ্রতিরোধ্য স্বভাব বুঝতে পারে। তখন ফজিলাকে এক প্রকার শাসিয়ে বলে, তুই যদি আমার কথা মতো কাজ না করিস আমি এ সন্তান আমি স্বীকার করুম না। ফজরের এই কথা ফজিলার মাথায় বজ্রপাতের মতো আঘাত হানে। কোন কথা তার মুখ দিয়ে বের হয় না। অসহায় অবোধ শিশুর মতো ফ্যাল ফ্যাল করে ফজরের পাপিষ্ঠ মখখানার দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পরে সে হঠাৎ কথা বলে। বলে, সব পুরুষ মানুষ একইরকম। এগোর কোন জাত নেই। ফজর কোন উ”চবাচ্য করে না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। ফজিলা অনুভব করে তার শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। কোন রকমে ঐ ¯’স্থান ত্যাগ করে বাড়িতে আসে।
নয়
ঐ ঘটনার পর হতে ফজিলা নিজেকে জগতের সবচেয়ে ঘৃণ্য প্রাণী মনে করে। বেচে থাকা তার জন্য এখন নিরর্থক। কুল-কিনারাহীণ ফজিলা আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। কোন এক কাক ডাকা ভোরে বাড়ির দক্ষিণ পাশের আমবাগানে গলায় রশি দিয়ে আত্মহত্যা করে ফজিলা। গ্রামের সবাই মনে করে রস্তুমের সংসার ছেড়ে একাকীত্ব জীবন নিয়ে বিষিয়ে উঠেছিল ফজিলা। তাই হয়ত শেষমেশ আত্মহত্যা করেছে। সকলের অলক্ষ্যে ফজরের কুকর্মের কথা ঢাকা পড়ে যায়। ফজরও হাফ ছেড়ে বাঁচে। থানায় আত্মহত্যা অপমৃত্যু মামলা হয়। কিš‘ সমাজের মানুষেরা কেউ জানে না প্রতিদিন এরকম হাজারও ফজিলা বৃক্ষের শুকনো পাতার মতো সবার অলক্ষ্যে ঝরে যা”চ্ছে। পাতা শুকালে যেমন বৃক্ষ তাকে ধরে রাখে না, ফজিলাদের প্রয়োজন ফুরালে এ পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তাদেরকে ঝেড়ে ফেলে দেয়, পদদলিত করে, কখনো কখনো আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে ভস্ম করে। শব্দ : ২৩৮১