ওয়াহিদ জামান
মাঘ মাস। কনকনে ঠান্ডা। চারিদিকে ঘন কুয়াশা। নিকট দূরত্বের কোনো কিছু দেখা যায় না। সূর্যের আলোর দেখা মেলে দুপুর নাগাদ। খুব ভোরে খেজুর গাছের গাছি ছাড়া জনমানুষের চিহ্ন পাওয়া যায় না। গবাদি পশুগুলো ঠান্ডায় কাতর হয়ে শুয়ে আছে আস্তানায়। খড়ের গাদায় মাথা গুঁজে শুয়ে আছে অবাঞ্ছিত কুকুরগুলো। অনেক দূরে দূরে খেটে খাওয়া দু-একজন মানুষ খড় জ্বালিয়ে গতর গরম করছে। এরকম কনকনে ঠান্ডা বিগত অর্ধ শতকে দেখা যায়নি। কঠোর ঠান্ডায় মানুষ ঘরবন্দি থাকে অর্ধবেলা পর্যন্ত। কিন্তু নরেনের নদীতে জাল ফেলতে হবে। একদিন জাল না ফেললে পেটে দানাপানি কিছুই পড়ে না তার পরিবারের। এক হালি কন্যা সন্তানের জনক সে। স্ত্রী মিনাক্ষী সারা বছর অসুস্থ থাকে। গতবছর যক্ষ্মায় তার জীবনের অর্ধেক আয়ু সাবাড় হয়েছে। যখন-তখন যায় যায় অবস্থা। কূল-কিনারাহীন নরেন জাল ফেলতে বের হয় খুব ভোরে। পথে ফটিকের সাথে দেখা। ফটিকদের বাড়ির কোল ঘেঁষে যে রাস্তা খোলপেটুয়া নদীর মাঝ বরাবর যেয়ে ঠেকেছে সে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে নরেন। বাড়ির পাশের রাস্তার উপরে খড় জ্বালিয়ে আগুন তাপাচ্ছে ফটিক। নরেনকে উদ্দেশকরে ফটিক বলে, ‘হ্যাতো ঠান্ডায় কনে যাতিচিস নরেন?’ – কনে আর যাতি পারি, গাঙে।ফটিক একটু অবাকই হয়। ঠান্ডায় যেখানে মানুষ কাতর হয়ে পড়েছে সেখানে নরেন যাচ্ছে নদীতে জাল ফেলতে। অবাক বিস্ময়ে বলে, ‘কী কলি তুই? মাতামুতু ঠিক আচে তোর?’নরেন কিছু বলে না। দ্রুত পায়ে হাঁটতে থাকে। নরেনের অগ্রাহ্য দেখে ফটিক চিৎকার দিয়ে বলে, ‘কুয়াশার মদ্দি মাচ ধরবি কিরাম কুরি, চোকে ঠাওর করতি পারবি?’ নরেনের উত্তর দেওয়ার ফুরসত নেই। হনহন করে হাঁটতে থাকে সামনের দিকে। খোলপেটুয়া নদীতে পৌঁছাতে মিনিট বিশেক সময় লাগে তার। নদীর পাড়ে ধমকা ঠান্ডা বাতাস যেন আরও বেশি বইছে আগের চেয়ে। গতরে প্যাঁচানো পুরোনো কাঁথা অস্থির হয়ে উঠছে বাতাসের তোড়ে। ঠান্ডায় শরীরের লোমের গোড়াগুলো ফুলে উঠেছে নরেনের। কুয়াশা যেন মেঘের মতো জমাটবদ্ধ হয়ে আছে। অল্প দূরের নদীর পাড়ের কিনারা ছাড়া কিছুই দেখে না নরেন। তবুও তার জাল ফেলতে হবে। হতাশ হওয়া তার যে বারণ আছে।মনে মনে ভাবে, গরিব মানুষের আবার হতাশা, গরিবের কুনো দুক্ক নাই। গরিব জন্মিচে কম্ম কুরার জন্যি। পোটলা থেকে জাল বের করে নরেন। লুঙ্গিটা পায়ের গোড়ালি থেকে তুলে মালকোঁচা মেরে জাল কাঁধে তুলে নেয়। নদীর ঢাল বেয়ে নিচে নেমে যায়। হাঁটু পানিতে নামতেই যেন ঠান্ডা পানির কামড় খায় সে। মনে হয় কামুটে পা কেটে নিয়ে যাবে। ঠন্ডার তীব্রতা এতটাই প্রখর যে দু-চার মিনিটের বেশি দাঁড়ানো যায় না। ডান হাতের কুনুইয়ে জাল বেঁধে যতদূর সম্ভব জাল ছুড়ে মারে নরেন। অল্প কিছু হরিণা চিংড়ি, আর বাঁশপাতা মাছ ছাড়া কিছুই জালে ওঠে না। এভাবে একের পর এক জাল ফেলতে থাকে নরেন। কয়েক ঘণ্টা পরে আধা খারা মাছ পায়। গতর আর চলতে চায় না। সকালে দুমুঠো মুড়ি ছাড়া কিছুই খায়নি সে। অল্পতেই সন্তুষ্ট নরেন আশাশুনি বাজারের উদ্দেশে রওনা দেয়। মাছ বিক্রি করে যে কয়টা টাকা হবে তা দিয়ে চালডাল কিনে বাড়ি ফিরতে হবে তার।
দুই
নরেনের স্ত্রী মিনাক্ষী যক্ষ্মায় মারা যায়। অভাবের সংসারে বিনা চিকিৎসায় চোখের সামনে ধুঁকে ধুঁকে স্ত্রীর মৃত্যু নরেন মানতে পারেনি। চার কন্যার মধ্যে বড়ো দুজন বিবাহযোগ্যা। বিবাহের সম্বন্ধ আসে কিন্তু নরেনের আর্থিক হালহকিকত দেখে কোনো সম্বন্ধ পাকা হয় না। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা যার তার মেয়ে কে বিবাহ করবে! নরেনের এ মুহূর্তে কি করা উচিত সে তা জানে না। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে মহাজনের নাওয়ে চাকরি নেয়। বর্ষার মৌসুমে সাগরে মাছ ধরতে যেতে হবে তার। মেয়েগুলোকে কার কাছে রেখে যাবে সে চিন্তায় রাতে তার ঘুম আসে না। জীর্ণ অপুষ্টি শরীরে এত বড়ো চিন্তার বোঝা সইতে পারে না সে। এদিকে সাগরে নাও ভিড়ানোর সময়ও ধীরে ধীরে কাছে চলে আসে। কোনো গতি না পেয়ে মহাজন বিমল বাবুকে সব খুলে বলে। মহাজন বিমল বাবু আশ্বস্ত করেন। তিনি নরেনের চার মেয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিজের এক কর্মচারীর সাথে নরেনের বড়ো মেয়ে আলতার বিবাহের বন্দোবস্ত করেন। নরেন খুশিতে আত্মহারা। মহাজনের পায়ে পড়ে আনন্দে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘মহাজন আপনে আমাগো ভগবান। সাক্ষাৎ দেবতা। কুনোদিন আপনের ঋণ শোধ করতি পারব না।’ মহাজন বিমল বাবু নরেনকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, ‘এসব কি কতিচিস তুই? তুই তো একন আমার কর্মচারী হুইচিস। আমার এট্টা দায়িত্ব আচে না? মহাজনের কথায় নরেন আশ্বস্ত হয়। মাথার উপর থেকে তার চিন্তার মেঘ সরে যায়। সে একরকম খুশি মনে সাগরের বুকে পাড়ি জমায়। সাগরে মাছ ধরা সোজা কাজ না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরের ঢেউ আর তীব্র স্রোতের সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয় মাঝিদের। নিরাপদে ফিরবে কি না তার কোনো গ্যারান্টি নেই। সবকিছু জেনেও নরেনরা সাগরে নাও ভিড়ায়। গরিব জেলেদের এছাড়া উপায় কী? যাওয়ার সময় কন্যাদের কাছ থেকে বিদায় নেয় নরেন। বড়ো কন্যা আলতার স্বামী কান্তিকে অনুরোধ করে বলে, ‘তুমার হাতে মাইয়াগো রেকি গিলাম বাপ। তুমি এদের দেকি রাকপা।’ কান্তি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলে, ‘আপনে হ্যাতো চিন্তা কত্তিচেন ক্যান? ওগোর কুনো গড়যত্ন হতি দেবো না।’ কিন্তু কান্তি তার কথা রাখেনি। মহাজন বিমল বাবুর চামচা সে। মহাজন নরেনের বড়ো মেয়ে আলতার সাথে তার বিয়ে দিয়েছে মানবিক কারণে নয়। নিজ হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য। পাচাটা কর্মচারীর স্ত্রীদের ঘরে রাতের অন্ধকারে যাওয়ার অনেক ইতিহাস আছে তার। আলতার সাথেও বিমল বাবু একই আচরণ করে। আলতা অনেক চেষ্টা করেও শেষমেশ নিজেকে রক্ষা করতে পারেনি। স্বামী কান্তি নিজে রাতের অন্ধকারে আলতাকে বিমল বাবুর ঘরে দিয়ে আসে। আলতা অনেক প্রতিবাদ করে কিন্তু কোনো কাজ হয় না। প্রথম যেদিন কান্তি আলতাকে মহাজনের মনোবাসনা পূরণ করতে বলে আলতা অবাক বিস্ময়ে বলে, ‘এডা আপনে কি কতিচেন? আমি না আপনের বিয়ি কুরা বউ?’ কান্তি কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে, তাতে কি হুয়িচে। স্বামী হিসেবে আমি তো কুনো আপত্তি কত্তিচিনে। আলতা রাগে ক্ষোভে কাঁপতে থাকে। কী বলবে বুঝতে পারে না। হঠাৎ অগ্নিমূর্তি হয়ে বলে, ‘আপনে এরাম জঘন্য তা জানতি পাল্লি কুনোদিন আপনের সাতে বিয়ি বসতাম না।’ কান্তি আলতার কথা গায়ে মাখে না। বলে, ‘সিডা অন্য কুতা। মহাজনের কৃপায় আমরা সুবাই বেঁচি আচি। তাকি অস্বীকার কত্তি পারবি?’ আলতা হতবিহ্বল হয়ে ফ্যালফ্যাল করে কান্তির দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে-মুখে ঘৃণা ও অসহায়ত্ব স্পষ্ট ফুটে ওঠে।

তিন
আলতাকে মহাজন বিমল বাবুর ঘরে নিয়মিত যেতে হয়। আপত্তি করলে স্বামী কান্তির সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করতে হয় তাকে। অসহায় আলতা সাগর থেকে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে। কিন্তু নরেন ফিরে না। ছয় মাস পরে নরেনের বাড়ি আসার কথা থাকলেও সে আসেনি। নিরুপায় আলতার দিন যেন শেষ হয় না। বছর পার হয়ে পরের বছর আসে। সাগর থেকে সকলেই বাড়িতে এসেছে। আবার কেউ কেউ যাচ্ছেও কিন্তু নরেন ফিরে আসে না। আলতা মুখ বুঝে এতদিন মহাজন বিমল বাবুর জৈবিক লালসা মিটিয়েছে কিন্তু এখন সে আর মানতে পারছে না। মহাজনের নজর এখন তার মেজো বোন রীতার দিকে। স্বামী কান্তি একদিন আলতাকে বলে, ‘তোর উপর অনেক ধগল যেতিচে তা আমি বুচতি পারি। কিন্তু কী কত্তি পারি ক?’ এটা কান্তির সহানুভূতি নয়। এ এক কূটকৌশল। এ সহানুভূতির অন্তরালে আছে এক নির্মম চালাকি। মানুষের জীবন যেন এমনই। সমাজের সকল নির্মম কূটকৌশল শুধু অসহায়কে আরও বেশি অসহায় করে তোলে। আলতা ঘৃণায় স্বামী কান্তির দিকে ফিরেও তাকায় না। নিজের কাজে ব্যস্ত হতে চায়। ধূর্ত কান্তি আলতার ভাব বোঝার চেষ্টা করে। আলতাকে নীরব দেখে বলে, ‘তুই ভুল বুচতিচিস ক্যান? আমি সব বুজি। সেই জন্যি তোর কাচে স্বামীর দাবিদাবা কুরা ছেড়ি দিচি।’ আলতা ক্ষিপ্ত হয়ে বলে, ‘কী কতি চাচ্চেন কুয়ি চুলি যান।’ কান্তি একটু দম নেয়। তারপর বলে, ‘মহাজনের খিদমত কুরা আপাতত তোর মনে হয় দরকার হোবে না। কিন্তু কী করবানে তাই চিন্তা কত্তিচি?’ কান্তির মতলব আলতা বুঝতে পারে। মেজো বোন রীতার দিকে মহাজন বিমল বাবুর নজর পড়েছে সেটা তার কাছে এখন স্পষ্ট। কান্তি কৌশলে তা বাস্তবায়ন করতে চায় আলতার তা বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু সে এই জঘন্য কাজ হতে দিবে না। নিজে যে নরককুণ্ডের লেলিহান দাবালনে পুড়ছে তা যেন তার কোমলমতি বোনটার জীবন স্পর্শ না করে সে ব্যাপারে আলতা সজাগ। কিন্তু এটাও সে ভাবে, তার মতো ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে এ জঘন্য দানবকে প্রতিহত করা কঠিন। তবুও তাকে সংগ্রাম করতে হবে। আলতা কান্তির সাথে ভাব জমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ধূর্ত কান্তিকে বশ করা কঠিন। কান্তি নানান কৌশলে রীতাকে মহাজনের কাছে পাঠানোর ফন্দি আঁটে। এজন্য বারবার আলতাকে বলে, ‘তোর শরীরডা কেমুন যেন হুয়ি যেতিচে আমি ভেবি দ্যাকলাম তোর আর মহাজনের কাচে পাটাব না। কিন্তু তারে তো খুশি রাকতি হবে। তার দয়ায় তো বেঁচি আচি আমরা। যকন যা চাতিচি, একেবারে মুটো ভুরি দিতিচে।’ আলতা কান্তির মুখে মহাজনের প্রশংসা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠে। কিন্তু ভয়ে কিছু বলে না। এদিকে বাবা নরেনেরও খোঁজখবর নেই। অসহায় আলতা ছোটো তিনটা বোন নিয়ে ভীষণ নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। বিশেষ করে রীতাকে নিয়ে তার খুবই দুশ্চিন্তা হয়।
চার
রীতার ব্যাপারে আলতার অনঢ় অবস্থা দেখে কান্তি কৌশল পরিত্যাগ করে। এখন সে রীতাকে মহাজনের কাছে পাঠানোর জন্য সরাসরি আলতাকে চাপ সৃষ্টি করে। আলতার একটাই জবাব, জীবন থাকতে সে রীতার জীবন নষ্ট হতে দিবে না। কান্তির অনড় সিদ্ধান্তে আলতা রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। কী করবে ভেবে পায় না। যে আগুনে নিজে জ্বলছে তার এতটুকু তাপ যেন তার নিষ্পাপ বোনের জীবন স্পর্শ করতে না পারে সে পরিকল্পনা করে আলতা। অবশেষে উপায়ন্তর না দেখে কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হয় সে। আজ রাতে সে মহাজনের কাছে যাবে। এটাই তার শেষ অভিলাষ। একটা ধারালো ছুরি সে সংগ্রহ করে। ধারালো ছুরি আরও বেশি শান দেয় সে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। আলতা আজ নবরূপে সাজে। আলতার সাজ দেখে রীতা জিজ্ঞেস করে, ‘এমুন কুরি সাজদিচিস ক্যান দিদি?’ রীতার প্রশ্ন শুনে অপলক মায়াবী দৃষ্টিতে একবার তার মুখের দিকে তাকায়। তারপর জিদমাখা কণ্ঠে বলে, ‘একজনের জন্মের সাদ মিটাই দিবার জন্যি।’ রীতা আলতার কথার আগামাথা কিছু বুঝতে পারে না। অসহায়ের মতো আলতার মুখপানে তাকিয়ে থাকে। রীতার নিষ্পাপ অসহায় মুখ দেখে আলতা আবেগ ধরে রাখতে পারে না। মুহূর্তেই চোখের কোণে নোনা জল চিকচিক করে ওঠে। মনে মনে ভাবে গরিব-অসহায়দের এ পৃথিবীতে কোনো আপনজন নেই, নেই কোনো ঈশ্বর। আলতার চোখে জল দেখে রীতা প্রশ্ন করে, ‘তুই কানতিচিস ক্যান দিদি?’ আলতা কোমল গলায় বলে, ‘জীবনে মেলা পাপ করিচি। আজগি মনে হয় পুণ্যের কাজ করতি যাতিচি।’ রীতা আর কিছু বলে না। নীরবে আলতার সাজসজ্জা দেখতে থাকে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আলতা বলে, ‘আমার কিচু হুয়ি গেলি তোরা কনে থাগবি কতি পারিস। মালা আর সীতাকে দেকিস।’ আলতার রহস্যময় কথার কোনো অর্থই বোঝে না রীতা। আলতার সাজসজ্জায় কান্তিও অবাক হয়। এভাবে সাজতে আলতাকে সে আগে কখনো দেখিনি। তার মধ্যেও প্রশ্ন জাগে। কৌতূহলবশত জিজ্ঞেস করে, ‘এরাম কুরি সাজদিচিস ক্যান তুই?’ অনিচ্ছা সত্ত্বেও কান্তির প্রশ্নের জবাব দেয় সে। কৃত্রিম মুচকি হাসি দিয়ে বলে, ‘মহাজনের কাছে যামু তাই এট্টু সাজদিচি।’ কান্তি অবাক হয়। মনে মনে ভাবে, ‘পাতরে ফুল ফুটিচে নাকি। যে আলতা নিজের ইচ্চায় কুনোদিন যাতি চায়নি, সে কি না যাবার জন্যি সাজদিচে।’ বুদ্ধিমতী আলতা বুঝতে পারে কান্তি তার কৌশল ধরে ফেলতে পারে। তাই রহস্যময় হাসি দিয়ে বলে, ‘আমি যাচ্চি শুধু রীতাকে মহাজনের কাছে মিলায় দিবার জন্যি।’ আলতার কথা শুনে কান্তি মহাখুশি। মহাজনের কাছে যাওয়ার আগে আর একবার ছুরিতে শান দেয় আলতা। রাতের প্রহর এগিয়ে যেতে থাকে। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে ছোটো বোনদের কাছে যায়। তিন বোনই অঘোরে ঘুমাচ্ছে তখন। মায়াবী ফুটফুটে বোনদের কপালে চুমু খায় আলতা। তারপর ঘর থেকে বের হয়। কয়েক কদম এগিয়ে যাওয়ার পর একটু দাঁড়ায়। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আশপাশের তেমন কিছু দেখা যায় না। পিছন ফিরে একবার তাকায়। কেন যেন বাড়ির প্রতি তার মায়া লাগে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হনহন করে মহাজনের বাড়ির উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করে। রাতের প্রথম প্রহর শেষে দ্বিপ্রহর এর আগমন। দরজার কড়া নাড়তেই দরজা খুলে দেয় মহাজন। মনে হয় আগে থেকেই আলতার আগমনবার্তা তার জানা ছিল। মহাজন বিমল বাবু অনেক খুশি হয় কারণ আলতা স্বেচ্ছায় তার কাছে এসেছে। আহ্লাদিত মহাজন বলে, ‘তোর জন্যি মেলাক্ষণ ধুরি অপেক্কা করতিচি। তোর দেরি দেকি আমার তর সতিছিল না।’ আলতা জবাবে কিছু বলে না। ভিতরে তার পাহাড়সম ক্রোধ ও জিঘাংসা। সবকিছু নিমিষেই সংবরণ করে একটা আবেদনময়ী হাসি দেয়। শরীরে প্যাঁচানো শাড়ি খুলতে খুলতে বলে, ‘বাতিডা নিভায় দেন।’ আবেগে আপ্লুত হয়ে মহাজন বলে, বাতি নিভাতে হবি ক্যান। তুই আমার সামনে কাপড়চোপড় খুলি ফ্যাল। এট্টু মন ভুরি দ্যাকতাম। মহাজনের কথামতো আলতা পোশাক খুলতে থাকে। আলতার শারীরিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ মহাজন আনন্দে কাঁপতে থাকে। শরীর-মনে এক আদিম অস্থিরতার ঢেউ খেলে যায়। পুলতিক অস্থির মহাজন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। এক মুহূর্ত বিলম্ব না করে আলতার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাতি নিভে যায়। কিছুক্ষণ পরে মহাজনের আত্মচিৎকারে পাশের বাড়ির সকলের ঘুম ভেঙে যায়। আশপাশের মানুষ মনে করে মহাজনের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। সকলে ডাকাত ডাকাত বলে চিৎকার দিয়ে ছুটে আসে। মহাজন বিমল বাবুর ঘরে এসে উপস্থিত সকলে হতবাক। কিছুটা বিবস্ত্র অবস্থায় আলতাকে পালঙ্কের একপাশে নীরবে বসে থাকতে দেখা যায়। এদিকে গোপন অঙ্গ দুহাতে চেপে ধরে যন্ত্রণায় ছটফট করছে মহাজন। রক্তের স্রোতধারা তার গোপন অঙ্গ থেকে প্রবাহিত হচ্ছে। পাশে লম্বা একটুকরা মাংসপিণ্ড লাফাচ্ছে। সকলে বুঝতে পেরেছে কী ঘটেছে। আলতা মহাজনের লিঙ্গচ্ছেদ করেছে। হঠাৎ কান্তি এসে উপস্থিত। সে আলতার কাছে গিয়ে বলে, ‘ইডা তুই কী করলি?’ আলতা কোনো জবাব দেয় না। কান্তি আবার বলে, ‘বাচতি চালি হ্যান থেকি চুলি যা। চল আমার সাতে। বেশি মানুষ জানার আগে তুই চুলি যা।’ আলতা তখনো নীরব। কান্তি উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘কিরে মরণ তোর ঘুনাই আইচে কিন্তু। পালা, চল তোরে গেরাম পার কুরি দেই।’ কিন্তু আলতা কোনো কিছুতে সাড়া দেয় না। প্রচণ্ড ক্ষোভের মধ্যে তার আনন্দ আসে। স্বামী কান্তির সর্বশেষ আচরণ তাকে মুগ্ধ করে। প্রথমে মনে হয়েছিল হাতের ছুরিটা কান্তির পেটে বসিয়ে দেবে। কিন্তু কান্তির এ পরিবর্তনে সে তা করে না।ইতোমধ্যে মানুষের উপচে পড়া ভিড় জমে। মহাজন আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। সকলে ধরাধরি করে গঞ্জের হাসপাতালে নেওয়ার পথে প্রচুর রক্তক্ষরণে মারা যায়। প্রভাতের আলোয় চারদিকে ফকফকা। আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ধেয়ে আসতে থাকে। লিঙ্গচ্ছেদের ঘটনা অত্র এলাকায় এই প্রথম। শত শত মানুষ মহাজন বিমল বাবুর বাড়ির চারপাশে ভিড় করে। গঞ্জ থেকে পুলিশ আসে। আলতাকে গ্রেপ্তার করে। হাতকড়া পরিয়ে মহাজন বিমল বাবুর ঘর থেকে তাকে বের করে পুলিশ। ভোরের স্নিগ্ধ আলোয় আলতাকে অনেক বেশি সজীব মনে হয়। খোলা চুলে স্বাচ্ছন্দ্যময় মুখ দেখে উপস্থিত জনতা বিস্মিত হয়। কেউ কেউ বলে, ‘খুন করিচে কিন্তু এরাম সুন্দর লাগদিচে ক্যান রে?’ পুলিশের ভ্যানে আলতাকে তোলে। গ্রামের সরু রাস্তা ধরে গঞ্জের দিকে গাড়ি চলতে থাকে। প্রফুল্ল চিত্তে চারপাশের প্রকৃতি উপভোগ করে আলতা। সে যেন নতুন প্রকৃতি দেখছে। গাছগুলো যেন পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে আকাশ ফুঁড়ে উপরে উঠছে। ভোরের নির্মল বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে জগতের সমস্ত পঙ্কিলতা। রাস্তার ধারে ছোটো ঘাসফুলগুলো আগের চেয়ে প্রাণবন্ত। ছোটো ছোটো পাখিগুলো মুক্ত আকাশে উড়ছে নতুন পৃথিবীর আগমনে। নির্মল আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে তার বিশালতায়। আলতার মনে হয় এ যেন সাত জনমের পুণ্যের ফল।