রাজধানীর যানজট নিরসনে চাই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম
জোড়-বেজোড় নাম্বারের গাড়িগুলো আমাদের রাজধানীতেও এক দিন পরপর চলাচল করতে দেওয়া যেতে পারে । ঢাকা মহানগীরর যানজট, পার্কিং সমস্যা, পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগের পরিপ্রেক্ষিতে আশু করণীয় হলো—পার্কিং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিনা মূল্যে পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, সর্বত্র জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেওয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা
গত ২৪ মার্চ মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে ‘
আধুনিকায়ন’ বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্তমূলক অনেক আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, “ট্রাফিক সিগন্যালগুলো আমরা অটোমেশনের ব্যবস্থা করছি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে। এখন সাতটা কাজ করছে, আর সপ্তাহ খানিকের মধ্যে আরো ছয়টা ইন্টারসেকশনে কাজ হবে সিগন্যাল মোড়ে । এরপর পর্যায়ক্রমে ১২০টার মতো সিগন্যাল আছে ঢাকা শহরে, সবই অটোমেশন করা হবে।’
ঢাকায় প্রতিদিন যানজট তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে । বিশেষ করে অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, বিপণিবিতান প্রভৃতি জায়গায় যাতায়াত করা এক দুঃসহ যন্ত্রণা । যানজটের কারণে কেবল রাজধানীতে প্রতিদিন বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা আয় নষ্ট হচ্ছে । সব মিলিয়ে যানজটের কারণে দিনে আর্থিক ক্ষতি প্রায় ১০০ কোটি টাকা। এছাড়া রাজধানীতে চলাচলকারী যানবাহন প্রতিদিন
যানজটের কারণে প্রায় সাড়ে সাত ঘণ্টা আটকে থাকে। তাতে শ্রমঘণ্টা অপচয়জনিত জাতীয় উৎপাদনশীলতার ক্ষতি হচ্ছে। তাহলে এ থেকে উত্তরণের উপায় কী?
যানজট সমস্যা মোকাবিলায় এর আগেও অনেক উদ্যোগের বাস্তবায়ন করেছে কর্তৃপক্ষ। দিনের বেলা শহরে ট্রাক ও আন্তঃনগর বাসের প্রবেশ বন্ধ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় রেলওয়ে স্টেশনটা রাজধানী শহরের মধ্যে হওয়ায় রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে অনেক ব্যস্ত রাস্তা একটা উল্লেখযোগ্য সময় ধরে বন্ধ থাকে, ফলে ট্রেন চলাচলের সময় বদলানো হয়েছে। বিভিন্ন রাস্তায় রিকশা চলা বন্ধ করা হয়েছে। পথচারী পারাপারের জন্য রাস্তায় যে জেব্রা ক্রসিং ছিল, সেগুলা বাতিল করে ফুটওভার ব্রিজ ও আন্ডারপাস তৈরি করা হয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি চালু করা হয়েছে । সর্বশেষ সিসি ক্যামেরাও বসানো হয়েছে । তাহলে কেন যানজট কমছে না?
এর অন্যতম কারণ রাস্তায় আইন মানছি না আমরা। যত্রতত্র গাড়ি দাঁড় করানো, ফুটপাত দখল, কম গতি, বেশি গতির পরিবহন সমানতালে চলা আর পরিবহন আধিক্যের কারণে সড়কে যানজট বেশি লাগে। এর মধ্যে প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় নামছে বিভিন্ন ধরনের নতুন পরিবহন। ২০৩০ সালে ঢাকায় জনসংখ্যা হবে ৩০ কোটি। এ প্রেক্ষাপটে যানজট নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার সময় এখনই । রাজধানী ঢাকাকে সবার জন্য বসবাসের উপযোগী করতে হলে যথাযথ সুদূরপ্রসারী ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন জরুরি ।
আমাদের যতটুকু সড়কপথ আছে, তাতে বর্তমান প্রেক্ষাপটে নানাবিধ পদক্ষেপ নিলে যানজট ৮০ ভাগ কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশ্বের বড় বড় শহর এমনকি হজের সময় মক্কা, মদিনা কিংবা অলিম্পিক গেমসহ নানা বড় আসরের সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে লক্ষ করলে দেখা যাবে, সে সময় কত সহজেই না যানজট নিয়ন্ত্রণ করছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো । চীনে যখন অলিম্পিকের মতো বড় আসর হলো, তখন কর্তৃপক্ষ এক দিন পর পর জোড়-বেজোড় নাম্বারের প্রাইভেট গাড়িগুলো চলাচল করার অনুমতি দিয়ে নতুন কৌশল বের করেছিল । বিশেষ মুহুর্তগুলোতে বাইরের শহরের গাড়িগুলো শহরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়নি। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে পত্রিকায় ঘোষণা দেওয়া হয়, ফলে দুর্ভোগ হয় না, হয় না যানজটও। জোড়-বেজোড় নাম্বারের গাড়িগুলো আমাদের রাজধানীতেও এক দিন পরপর চলাচল করতে দেওয়া যেতে পারে। ঢাকা মহানগীরর যানজট, পার্কিং সমস্যা, পরিবেশদূষণ ও জনদুর্ভোগের পরিপ্রেক্ষিতে আশু করণীয় হলো—পার্কিং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন, বিনা মূল্যে পার্কিং বন্ধ করা এবং অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করা, সর্বত্র
জায়গা ও সময়ের মূল্যানুসারে পার্কিং ফি নেওয়া, পার্কিং থেকে প্রাপ্ত অর্থ পাবলিক পরিবহনের মানোন্নয়নে ব্যয় করা। নগরের ব্যস্ততম এলাকায় প্রাইভেট কার চলাচলের ক্ষেত্রে কনজেশন চার্জ গ্রহণ করা, প্রাইভেট কারের লাইসেন্স সীমিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালতে প্রাইভেট গাড়ির পরিবর্তে পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা করা, প্রাইভেট গাড়িনির্ভর অবকাঠামো (ফ্লাইওভার, পার্কিংয়ের স্থান তৈরি) নির্মাণ না করা। পাবলিক পরিবহন ও পথচারীদের সুবিধা বৃদ্ধি করা।
জায়গা ও সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ও প্রাইভেট কারের পার্কিং সমস্যা সমাধানে পার্কিংয়ের জন্য সময় ও স্থান অনুসারে অর্থ গ্রহণই যুক্তিযুক্ত।
ফিলিপাইনে একসময় তীব্র যানজট ছিল। সেখানে স্বাভাবিক চলাচল ছিল কষ্টসাধ্য । যতদূর জানি সেখানকার ট্রাফিক ব্যবস্থা এখন বেশ নিয়ন্ত্রিত। কীভাবে? ভালো একটি আইন তৈরি হয়েছে ফিলিপাইনে। ফিলিপাইনের আইন অনুসারে সেখানে কোনো গাড়ির লাইসেন্স নাম্বার প্লেটের অক্ষরটা যদি ১ অথবা ২ দিয়ে শেষ হয়, তবে সেই গাড়িটি রাস্তায় সোমবার থাকার অনুমতি পাবে না। আবার যদি সেটা ৩ বা ৪ দিয়ে শেষ হয়, তাহলে মঙ্গলবার গাড়িটাকে থাকতে হবে ঘরেই। ৫ ও ৬ যাদের গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ অক্ষর, তারা তাদের গাড়ি নিয়ে বেরোবেন না বুধবার । বৃহস্পতিবার রাস্তায় থাকবে না সেসব গাড়ি, যেগুলোর লাইসেন্স প্লেটের শেষে রয়েছে ৭ ও ৮ । আর ৯ ও ০ যাদের গাড়ির লাইসেন্স প্লেটের শেষ নম্বর, তারা বাড়িতেই থাকেন শুক্রবার। ফিলিপাইনের এই আইনটা কি অনুসরণযোগ্য নয়?
রাজধানী ঢাকার যানবাহনের প্রায় ৮০ শতাংশ প্রাইভেট কার । একটি রিপোর্টে দেখা যায় যে, রাজধানীর মোট রাস্তার ৫৪.২ শতাংশ জায়গা
দখলে রাখে প্রাইভেট কার। একটি পরিসংখ্যান মতে, গত ১০ বছরে শুধু রাজধানীতে যানবাহন বেড়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ১০০ তিনটি । ট্র্যাফিক বিভাগের হিসাবমতে, সড়কের কম করে হলেও ৩০ ভাগ বা তারও বেশি দখল হয়ে আছে অবৈধ পার্কিং এবং নানা ধরনের দখলদারদের হাতে। আরেকটি মজার হিসাবও আছে। ঢাকায় ১৫ ভাগ যাত্রী দখল করে আছে মোট সড়কের ৭০ ভাগ। ফলে যানজটে এমনই অচলাবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে যে, আধাঘণ্টা দূরত্বের সড়ক অতিক্রম করতে গড়ে
সাত-আট গুণ পর্যন্ত সময় লাগছে। তাই রিকশার পাশাপাশি প্রাইভেট কারের আধিক্য কমাতে হবে । ঢাকার রাজপথের অবৈধ দখলদারিত্বের সঙ্গে রাজনৈতিক টাউট, পাড়া-মহলার মস্তান এবং পুলিশের যে সম্পর্ক রয়েছে, তা দূর করতে হবে।
কয়েকটি প্রস্তাব বাস্তবায়ন হলে যানজটের সমস্যা থেকে ঢাকাবাসী মুক্তি পেতে পারেন । ১. বিশ্বের যেসব শহরে আগে যানজট ছিল, এখন নিয়ন্ত্রিত তাদের পদক্ষেপ ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো। ২. সরকার যানজট সমস্যা নিরসনে দেশি ও বিদেশি সদস্যের সমন্বয়ে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করতে পারে। ৩. রাজধানী ঢাকার প্রাইভেট কারের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৪. অবৈধ দখলদারদের নিকট থেকে ফুটপাত ও অন্যান্য রাস্তা দখলমুক্ত করতে হবে । ৫. রেল ক্রসিংগুলোতে ওভারব্রিজ তৈরি করলে যানজট অনেকাংশে নিরসিত হবে। ৬. গাড়ির চালককে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। ৭. রাজধানীতে সৎ, পরিশ্রমী এবং সাহসী ট্রাফিক পুলিশ অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। সর্বোপরি যানজট নিরসনে নাগরিক সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতারও বিকল্প নেই ।

  • লেখক : সাবেক কর কমিশনার ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান–ন্যাশনাল এফএফ ফাউন্ডেশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *