একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক খালেদা জিয়া

ড. এস এম জাহাঙ্গীর আলম

প্রত্যেক প্রজন্মেই একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক থাকেন, যিনি ভিন্ন কিছু করেন। চেষ্টা না করার চেয়ে ঝুঁকি নিয়ে হেরে যাওয়া অনেক ভালো। ১৭৭৫ সালের মার্চে প্যাট্রিক হ্যানরি যুক্তরাষ্ট্রে একটি ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমরা যদি স্বাধীন হতে চাই তবে আমাদের লড়তে হবে। দ্বিধা ও নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে কখনো শক্তি অর্জন করা যায় না। জীবন কি এতই প্রিয় কিংবা শান্তি কি এতই মধুর যে, শিকল ও দাসত্বের বিনিময়ে তা ক্রয় করতে হবে? পক্ষপাতিত্ব ও প্রত্যয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। পক্ষপাতিত্ব হস্তান্তরযোগ্য। প্রত্যয় তা নয়। অবস্থার চাপে স্বজনপ্রীতি দুর্বল হতে থাকে আর প্রত্যয় হয় দৃঢ়। প্রশ্ন হলো, জনগণ স্থিতিশীল নয় কেন? তারা তা নয়, কারণ তা অসুবিধাজনক। নাগরিক যখন প্রত্যয়ের চেয়ে সুবিধাকে বেছে নেয়, তখন দেশের অবনতি ঘটে। যেসব নাগরিক নীতির ঊর্ধ্বে সুবিধাকে স্থান দেয়, তারা উভয়কেই হারায়। সুনাগরিকের জন্য দেশপ্রেম জীবনের একটি পন্থা। উৎসর্গ মানে সবসময় হারানো নয়, বরং বেছে নেওয়ার চেয়ে বেশি কিছু। এর অর্থ হলো বৃহত্তর অর্জনের জন্য ক্ষুদ্রতর বিসর্জন। মহৎ নেতৃত্ব বিরক্তি নয়, বরং স্বেচ্ছায় উৎসর্গ করেন। দেশের বৃহত্তর স্বার্থের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ ত্যাগ করতে পারলে দেশ উন্নতির পথে অগ্রসর হয়। যারা দেশের জন্য মৃত্যুবরণ করেন, তারা জীবিতদের মধ্যে জীবনের স্ফূলিঙ্গ ছড়িয়ে দেন। দেশকে ভালোবাসার মানে সামাজিক ত্রুটির প্রতি অন্ধত্ব কিংবা সামাজিক বিশৃঙ্খলার প্রতি বধিরতা। পরিবার ও জাতির জন্য ত্যাগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। কোনো ব্যক্তি যখন পরিবারের জন্য ত্যাগ করে তখন সে পরিবার লাভবান হয়। কোনো ব্যক্তি যখন জাতির জন্য কিছু করে, তখন সে জাতি চিরতরে কিছু অর্জন করে, যদিও সে ব্যক্তির পরিবার চিরদিনের জন্য হারায়। আত্মস্বার্থ ও উৎসর্গের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হলে দ্বিতীয়টিকে প্রাধান্য দিতে হবে। ইতিহাসের বিখ্যাত নেতারা ব্যক্তিগত কর্মসূচিকে জাতীয় কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করে নিতেন। জীবনের কোনো নিশ্চয়তা নেই। সফলতার কোনো সহজ, নির্বিঘ্ন  দ্রুত উপায় নেই। দেশপ্রেম কি জাতীয় গর্ব, না উগ্র স্বাদেশিকতা ? অবশ্যই জাতীয় গর্ব। আমার দেশ তোমার দেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর- এমন অভিব্যক্তির মাধ্যমে মূলত দেশপ্রেম প্রকাশ করাটা জরুরি নয়। এটি অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বিকৃত অভিব্যক্তি। যে দেশপ্রেম অন্য জাতিকে হেয় করে তা উৎকট স্বাদেশিকতা এবং বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে। জাপানিদের উন্নয়নের একটি প্রধান কারণ হলো, তাদের দেশপ্রেম জাতীয় অহংকারে পরিণত হয়েছে। মানসম্মত পণ্য এবং দায়িত্বপূর্ণ আচরণ জাপানি দেশপ্রেমের নিদর্শন।

প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতো সৎ, নির্ভীক, দেশপ্রেমিক নেতা দেশের ইতিহাসে সৃষ্টি হয়নি। ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার পর দেখা গেল, তার একখণ্ড জমি নেই। ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। তার স্ত্রী, পুত্র ও পরিবারকে তিনি যেভাবে লালন করিয়েছেন, সে রকম উদাহরণ খোলাফায়ে রাশেদিনের পর মুসলিম বিশ্বে আর দেখা যায়নি। তার সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তিনি (জিয়াউর রহমান) ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ নামে জাতিকে একটি রাজনৈতিক দর্শন উপহার দিয়েছেন জিয়া। তিনিই একমাত্র রাষ্ট্রপতি ছিলেন যার কাছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সাধারণ মানুষ যেতে পারত। যিনি তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। জিয়াউর রহমান পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে আমার প্রশিক্ষক ছিলেন। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে তিনি আমাদের সিনিয়র কর্মকর্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন আমাদের ব্রিগেড কমান্ডার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন খাঁটি দেশপ্রেমিক। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। তার সরকার অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব সাফল্য নিয়ে আসে, যা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেই সময়ের অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও স্বীকৃতি পায়। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রের টাইমস ম্যাগাজিনের কভার প্রতিবেদন তাকে ‘বাংলাদেশ ইমার্জিং টাইগার’ শিরোনামে তুলে ধরে, যা ছিল দেশের অর্থনৈতিক উত্থানের এক শক্তিশালী প্রমাণ।

কিন্তু এই সাফল্য কিছু দেশি-বিদেশি কুচক্রী মহলের ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুরু হয় সরকার বিরোধী আন্দোলন, যেখানে আওয়ামী লীগসহ কয়েকটি দল রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এমনকি ‘জনতার মঞ্চ’ নামে সিভিল প্রশাসনের কর্মকর্তাদের একাংশের উপস্থিতি এবং সংসদ থেকে বিরোধী দলের পদত্যাগ দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সংকটের মুখে ফেলে দেয়। বেগম খালেদা জিয়া মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তার আগে কেবল বেনজির ভুট্টোই মুসলিম কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছিলেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি তিনবার গণতান্ত্রিকভাবে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। এতেই বোঝা যায় তার জনপ্রিয়তা। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তার উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলো- নির্বাচনে কখনো পরাজিত না হওয়া নেতা। রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রেকর্ড হলো তিনি জীবনে কখনো কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে (১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনসহ) তিনি মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং প্রতিটি আসনেই বিজয়ী হন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন ভিন্ন এতগুলো আসন থেকে নির্বাচন করে শতভাগ সাফল্যের নজির আর কারও নেই। একসময় দেশের নির্বাচনী আইনে একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারতেন। সেই সুযোগে বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১, ১৯৯৬ (জুন) ও ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি করে মোট ১৫টি আসনে দাঁড়িয়ে সবকটিতেই জয় পান। অর্থাৎ তিনি টানা তিন নির্বাচনে পাঁচ আসনে জয়ের বিরল ‘হ্যাটট্রিক’ করেন। আইন পরিবর্তনের পর ২০০৮ সালে তিনি তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে তিনটিতেই নির্বাচিত হন। দেশের শীর্ষ রাজনীতিকরা সাধারণত নিজ জেলা বা রাজধানীকেন্দ্রিক থাকলেও খালেদা জিয়া ব্যতিক্রম। তিনি বগুড়া, ফেনী, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লক্ষ্মীপুর ও খুলনাসহ দেশের ছয়টি ভিন্ন জেলা থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার এই ব্যাপক জনপ্রিয়তার রেকর্ডও তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র নারী, যিনি একইসঙ্গে ‘ফার্স্ট লেডি’ এবং পরে ‘প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হিসেবে তিনি ছিলেন ফার্স্ট লেডি, আর পরবর্তীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে হন দেশের সরকারপ্রধান। গৃহিণী থেকে রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হওয়ার এই যাত্রা রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। ১৯৭৫ সালের পর দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা চালু ছিল। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া দ্বাদশ সংশোধনী পাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবার সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনেন। রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা বহাল রেখে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ থাকলেও তিনি সংসদকে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরিয়ে দেন, যা তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তার সরকারের সিদ্ধান্তগুলো ছিল বৈপ্লবিক। দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে দেশের নারীশিক্ষায় আমূল পরিবর্তন আসে। এই কর্মসূচি নারীদের কর্মজীবন ও সামাজিক অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং আন্তর্জাতিক মহলেও এটি একটি সফল ‘রোল মডেল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০০১ সালে তার সরকারই প্রথমবারের মতো ‘মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়’ গঠন করে। স্বাধীনতার তিন দশক পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য আলাদা পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সুযোগ-সুবিধাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। এটিও তার সরকারের একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ। পরিবেশ সুরক্ষায় ২০০২ সালে তার সরকার পলিথিন শপিং ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। বিশ্বের প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি হিসেবে বাংলাদেশ এ সিদ্ধান্ত নেয়, যা সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয় এবং পরিবেশ আন্দোলনে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ১৯৯২ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বেগম খালেদা জিয়া সংস্থাটির প্রথম নারী চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। দক্ষিণ এশিয়ার মতো রক্ষণশীল অঞ্চলে এটি ছিল নারী নেতৃত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর গঠিত স্বল্পস্থায়ী সংসদে তিনি ত্রয়োদশ সংশোধনী পাস করেন। এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের অংশ হয়। বিরোধী দলের দাবির প্রেক্ষিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ সুগম করতে এমন সাংবিধানিক পরিবর্তন রাজনীতিতে বিরল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন, নির্বাচনী সাফল্য ও রাষ্ট্রীয় সংস্কার বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এক স্থায়ী আসনে অধিষ্ঠিত করেছে। তার দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল রাজনৈতিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি হলেও, রেখে যাওয়া এই রেকর্ডগুলো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদতের পরে তিনি জনগণকে বাঁচাতে রাজনীতিতে আসতে বাধ্য হন। অথচ রাজনীতির প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। কিন্তু দেশ তার কাছে ছিল পরিবারের চেয়েও বড় কিছু। তাই মানুষের ডাক তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। টানা ২৯ বছর তিনি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবদী দলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দেশের জন্যে ত্যাগ কাকে বলে সেটা জানা যায় তার জীবনী থেকে। একাত্তরে স্বামী গেছেন রনাঙ্গনে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে আর তিনি বন্দি থেকে পাকিস্তানিদের নির্যাতন সহ্য করেছেন। তার সময়ে যত রাস্তা, ঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট তৈরি হয়েছে বাকি সরকারের সময় যোগ করেও এতগুলো তৈরি হয়নি। তিনি দেশের সবচেয়ে বড় সেতু যমুনা সেতু তৈরি করে উন্নয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। স্বামীর মতই তিনি দক্ষভাবে পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের সকল দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টি করেন। যার ফলে কোটি কোটি মানুষ আজ আরব বিশ্বে চাকরি করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। এটা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা আর বিচক্ষণতার ফলেই সম্ভব হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং দার্শনিকও বটে। তার সময়ে দ্রব্যমূল্য মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে রেখেছিলেন। তিলে তিলে কষ্ট করে তিনি দেশটাকে সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও দারিদ্র‍্যমুক্ত করেছিলেন।

লেখক: সাবেক কর কমিশনার   প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানন্যশনাল এফ এফ ফাউন্ডেশন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *